কিশোরদের সামনে রেখে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে চট্টগ্রামের একাধিক ‘বড় ভাই’-এর বিরুদ্ধে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি সামনে এসেছে। কারো ছবি রাজনৈতিক কর্মসূচির, কারো ব্যক্তিগত।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এসব ব্যক্তির কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক ও দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে।
পুলিশের তথ্য ও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর্যালোচনায় দেখা যায়, কিশোরদের সামনে রেখে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগকে নিজেদের দাপটের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
কারো রাজনৈতিক পরিচয় সময়ের সঙ্গে বদলেছে কিন্তু অভিযোগের ধরন বদলায়নি। তবে যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ উঠেছে, তাদের কেউ কেউ তা অস্বীকার করেছেন।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ২০২৪ সালের জরিপে নগরীতে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য উঠে আসে। সদস্য ছিল প্রায় ১,৪০০। নগরীর ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এসব গ্যাংয়ের প্রভাব ছিল বলে পুলিশ জানায়।
কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পাঁচজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জন ‘বড় ভাই’-এর তালিকাও করেছিল পুলিশ। বর্তমানে তাদের বেশিরভাগই পলাতক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদের জায়গায় দখল নিয়েছেন বর্তমান মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সমস্যা শুধু কিশোরদের নয়; কিশোরদের সংগঠিত করা, ভয় দেখানো বা সংঘর্ষে ব্যবহার করার পেছনে বড়দের ভূমিকা রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, আমরা কিশোর গ্যাংয়ের যারা বড় ভাই, তাদের বিষয়ে কঠোর। তার দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের লিডারদের গ্রেপ্তারে এখন পর্যন্ত কেউ তদবির করেননি। সরকারের বার্তা স্পষ্ট—প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের ছবি
এই যোগসূত্রের আলোচিত উদাহরণ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। পুলিশের কাছে তিনি বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে অক্সিজেন এলাকায় জোড়া খুন এবং পরে চান্দগাঁওয়ে প্রকাশ্য হত্যার ঘটনায় তার নাম আসে বলে পুলিশ জানায়।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর অক্সিজেন এলাকায় তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা হলে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন আহত হন।
২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ফেসবুক লাইভে এসে বায়েজিদ বোস্তামী থানার তৎকালীন ওসিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তিনি আলোচনায় আসেন। পরে তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। একই বছরের মার্চে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, ছোট সাজ্জাদের বাহিনীতে প্রায় ২৫ জন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর সহযোগীদের একটি অংশের নেতৃত্বে আসেন রায়হান আলম। ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের একাধিক ছবি রয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাকে দেখা গেছে।
তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে মীর হেলাল বলেছেন, সাজ্জাদকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং তিনি তার দলের কেউ নন।
এমপির সঙ্গে গ্যাং লিডার রায়হান
ছোট সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পুলিশের ভাষ্যে উঠে আসা রায়হান আলমের বিরুদ্ধেও হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের পর নগর ও জেলায় তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়, যার ছয়টি হত্যা মামলা বলে পুলিশ জানায়।
রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, রায়হানের নেতৃত্বে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, কারাগারে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে রায়হানের পরিচয় হয়। ৫ আগস্টের পর দুজনই জামিনে বের হন। সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর রায়হানের নেতৃত্বে তার সহযোগীদের একটি অংশ সক্রিয় হয়।
রাউজান ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা গড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাউজানে যুবদলকর্মী আলমগীর আলম হত্যার ঘটনায়ও তার নাম এসেছে। রায়হানের ফেসবুক কাভারে রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তোলা একটি ছবি দেখা গেছে।
বাকলিয়ার এমপির সঙ্গে মুরাদের ছবি
বাকলিয়ায় মুরাদের বিরুদ্ধেও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর সৈয়দ শাহ রোড এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুরাদ ও জসিমের পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
পুলিশ জানায়, মুরাদের বিরুদ্ধে সিএমপির বিভিন্ন থানায় ১৬টি মামলা রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর পটিয়া থেকে দুই সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মাদক ব্যবসা, জায়গা দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে এবং উভয়পক্ষই কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে। বাকলিয়ার সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ানের সঙ্গে মুরাদের ছবি রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার ‘সেভেন স্টার’
খুলশী-পাহাড়তলী এলাকায় ওয়াকিল হোসেন বগার বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তিনি একসময় চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। চলতি বছরের জুনে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, চাঁদাবাজি, মাদক ও বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি ১৬ বছর বয়সি হৃদয় হত্যাকাণ্ডে বগার নাম আলোচনায় আসে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ‘সেভেন স্টার’ নামে একটি কিশোর গ্যাং বগা ও তার ভাইয়ের নির্দেশে চলে। নিহত হৃদয়ও ওই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, অভিযোগ থাকে
চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযুক্তদের কারো রাজনৈতিক পরিচয় সময়ের সঙ্গে বদলেছে। কেউ আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে বিএনপি বা এর অঙ্গসংগঠনের পরিচয়ে সক্রিয় হয়েছেন। কেউ দলীয় পদে থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কেউ আবার কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসার ছবি ব্যবহার করেছেন।
যুবদল নেতা এমদাদুল হক বাদশার বিরুদ্ধেও ৫ আগস্টের পর চকবাজার, ডিসি রোড, এক্সেস রোড ও বাকলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পুলিশের খাতায় যুবদলের গাজী সিরাজের নামও রয়েছে। বাকলিয়ায় এক ছাত্রদল নেতা হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধের প্রসঙ্গ এলে বাদশা ও সিরাজের নাম আসে। পুলিশ সূত্রের দাবি, তারা একাধিক কিশোর গ্যাং পরিচালনা করেন।
পুলিশ সূত্র আরো জানায়, বড় সাজ্জাদের একসময়ের সহযোগী সরওয়ার বাবলা পরে খুন হন। তার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরী ও জামায়াতের সাতকানিয়া আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ছবি রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোররা কখন, কোথায় ও কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে বাড়ি ফিরছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখতে বলা হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



