বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে আজ আর আগের দিনের সেই কুঁড়েঘর, দিগন্তছোঁয়া সবুজ কিংবা ধূধূ মাঠ খুব একটা চোখে পড়ে না। বনানির আড়ালে গড়ে উঠেছে ঘন বসতি। কোথাও ছোট ছোট পাকা দালান, কোথাও টিনের ঘর—গ্রামীণ জনপদের চেহারা বদলে গেছে অনেকটাই।
বাংলাদেশের কিছু কিছু গ্রাম আজ এতটাই সমৃদ্ধ যে সেখানকার বাড়িঘর দেখলেই প্রাচুর্যের ছাপ চোখে পড়ে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। আবার গ্রামের অনেক মানুষ ব্যবসা বা চাকরির কারণে শহরে বসবাস করলেও নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে অবসর কাটাতে চান। তারাও তৈরি করছেন ছোট কিংবা মাঝারি আকারের দ্বিতীয় আবাস।
আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন গ্রামে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণের প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে আসছে। কিন্তু এসব বাড়ির অধিকাংশই মূলত ব্যক্তিগত বসবাসের জন্য নির্মিত হচ্ছে। একটু পরিকল্পনা, নান্দনিকতা এবং বাণিজ্যিক চিন্তা যুক্ত করা গেলে এই বাড়িগুলো শুধু বসবাসের স্থান না হয়ে উঠতে পারে পর্যটনকেন্দ্রিক হোম স্টে, যা একই সঙ্গে পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের উৎস এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নতুন ক্ষেত্র।
গ্রামে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পর্যটনব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে শহর বা নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রিক। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, বান্দরবান কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করেই পর্যটনের মূল প্রবাহ গড়ে উঠেছে। অথচ সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে গ্রামে।
বিদেশি পর্যটকরা শুধু দর্শনীয় স্থান দেখতে চান না; তারা জানতে চান একটি দেশের মানুষ কীভাবে বসবাস করে, কী খায়, কীভাবে কৃষিকাজ করে, কীভাবে উৎসব পালন করে এবং কীভাবে ঐতিহ্যকে ধারণ করে। একজন বিদেশি পর্যটকের কাছে এগুলো নিছক ভ্রমণ নয়—এগুলো একটি দেশের জীবন ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার অভিজ্ঞতা।
আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন পর্যটন প্ল্যাটফর্ম এই অভিজ্ঞতাকে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ।
প্রথমেই দরকার পর্যটনবান্ধব আবাসন
গ্রামকে পর্যটনের আওতায় আনতে হলে প্রথমেই নজর দিতে হবে বাসস্থানের দিকে।
গ্রামে যারা নতুন পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন, তাদের বোঝানো যেতে পারে—একটি সুন্দর ও মানসম্মত বাড়ি শুধু নিজের পরিবারের বসবাসের জন্য নয়, চাইলে সেটি বাড়তি আয়ের উৎসও হতে পারে।
অনেকেই দোতলা বা তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। তাদের যদি উৎসাহিত করা যায়, তাহলে বাড়ির একটি বা দুটি তলা পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে সাজানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানের সব সুবিধা না থাকলেও পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, আরাম এবং স্থানীয় সংস্কৃতির স্বাদ নিশ্চিত করা গেলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় রুরাল হোম স্টে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের হোম স্টেব্যবস্থা জনপ্রিয়। বাড়ির মালিক নিজেই অতিথিদের গ্রহণ করেন, তাদের খাবার পরিবেশন করেন এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এতে পর্যটক যেমন একটি দেশের প্রকৃত জীবনকে জানতে পারেন, তেমনি পরিবারও পায় অতিরিক্ত আয়।
কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে
১. বাড়ি নির্মাণে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা।
গ্রামীণ পর্যটনবান্ধব আবাসন গড়ে তুলতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
নির্মাণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মান বজায় রাখা, রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব বাড়ি তৈরির মডেল ও নির্মাণকে নির্দেশিত করতে পারে।
২. সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা
বাড়ির মালিক নিজ উদ্যোগে আবাসন নির্মাণ করলে পর্যটন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, পর্যটনবান্ধব হোম স্টে তৈরির জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ, গ্রামের একটি সাধারণ বাড়িকে সামান্য বিনিয়োগের মাধ্যমে পর্যটনবান্ধব আবাসনে রূপান্তর করা সম্ভব।
৩. প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ
শুধু বাড়ি তৈরি করলেই হোম স্টে সফল হবে না। অতিথি ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, রান্না, খাবার পরিবেশন, প্রাথমিক চিকিৎসা, পর্যটকের সঙ্গে আচরণ এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রতিটি হোম স্টে থেকে এক বা দুজনকে পর্যটন সংস্থার তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যোগ্যতার সনদ দেওয়া যেতে পারে। পর্যটন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে মান বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারে।
৪. পর্যটকদের জন্য কেন্দ্রীয় বুকিং ব্যবস্থা
পর্যটকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বুকিং ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। অনুমোদিত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ট্রাভেল এজেন্সি এবং অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হোম স্টেগুলো যুক্ত করা যেতে পারে। পর্যটক যেন নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘর বুক করতে পারেন এবং নিরাপদ ইলেকট্রনিক পেমেন্টের (ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড) সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে একটি সামাজিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।
গ্রামীণ পর্যটন শুধু ব্যবসা নয়
পর্যটনবান্ধব গ্রামীণ আবাসনকে শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। এটি হতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের একটি কার্যকর হাতিয়ার।
একজন পর্যটক যখন একটি গ্রামে থাকবেন, তখন শুধু বাড়ির মালিকই উপকৃত হবেন না। স্থানীয় কৃষক, জেলে, তাঁতি, কারিগর, পরিবহনকর্মী, রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান, গাইড—অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আয়ের সুযোগ পাবেন।
সরকারের জন্য একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ
পর্যটনবান্ধব গ্রামীণ আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে প্রথম পর্যায়ে কয়েকটি গ্রাম নির্বাচন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রাম বদলে গেছে। কিন্তু গ্রামের প্রাণ, প্রকৃতি, মানুষের আন্তরিকতা এবং জীবনযাত্রার স্বকীয়তা এখনো অটুট। সেই পরিবর্তিত গ্রামীণ বাস্তবতাকে আধুনিক পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সময় এসেছে।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা ও আবাসন ব্যবসায়ী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

