লেখাপড়া, চাকরি ও ভ্রমণের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ চান আন্তর্জাতিক মুসলিম শিক্ষার্থীরা। বৈচিত্র্য ও ধর্মীয় সহনশীলতার দিক থেকে বিশ্বের সব দেশ এক নয়। তবে বেশ কয়েকটি দেশ মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করে চলেছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ২০২৬ সালের শীর্ষ ১২টি মুসলিমবান্ধব দেশের তালিকা তুলে ধরা হলো—
১. যুক্তরাজ্য
ইউরোপের অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক রাজধানী যুক্তরাজ্য। কোয়াকোয়ারেলি সিমন্ডসের বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং অনুযায়ী এখানকার ইমপিরিয়াল কলেজ লন্ডন, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। দেশটির জনসংখ্যায় প্রায় ৪০ লাখ মুসলিম বসবাস করছেন। যুক্তরাজ্যে বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য ও অনলাইন নিপীড়ন রোধে ‘পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট ১৯৮৬’ এবং ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট ২০২৩’-এর মতো কঠোর আইন রয়েছে।
২. মালয়েশিয়া
সরকারি ধর্ম ইসলাম হওয়ায় মালয়েশিয়ার জীবনযাত্রায় ইসলামী ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব রয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৮ শতাংশ মালয়ি মুসলিম। এখানে সহজে হালাল খাবার, পৃথক প্রার্থনাকক্ষ এবং অজুখানা পাওয়া যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিশি মালেয়াসহ দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের তালিকায় থাকে।
৩. তাইওয়ান
প্রথম দেখায় নাম না এলেও অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান দ্রুত মুসলিমবান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে।
গ্লোবাল মুসলিম ট্রাভেল ইনডেক্সে (জিএমটিআই) অ-মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এটি তৃতীয় স্থানে রয়েছে। তাইওয়ানের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মুসলিমদের জন্য পৃথক প্রার্থনাকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি ঐতিহাসিক ‘তাইপে ১০১’ ভবনে কেবলামুখী দিকনির্দেশক যুক্ত করা হয়েছে।
৪. ব্রুনাই
তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির দেশ ব্রুনাইতে ৮২ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম। এখানে জীবনযাত্রার মান বেশ উন্নত। দেশটির দৈনন্দিন জীবন ও বিচারব্যবস্থায় শরিয়াহ আইন কার্যকর রয়েছে। নিরাপদ পরিবেশ ও উন্নত ধর্মীয় অবকাঠামোর কারণে মুসলিম শিক্ষার্থীরা এখানে স্বচ্ছন্দে পড়াশোনা করতে পারেন।
৫. জর্ডান
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানে। দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ মুসলিম। রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এ দেশটি সম্প্রতি বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে, যা সেখানকার অর্থনৈতিক ও শিক্ষার পরিবেশকে সমৃদ্ধ করছে।
৬. সৌদি আরব
ইসলামের জন্মস্থান সৌদি আরবে রয়েছে মক্কা ও মদিনার মতো পবিত্র স্থানগুলো। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মুসলিম এখানে হজ ও ওমরাহ পালন করতে যান। উচ্চশিক্ষায় কিং ফাহাদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস এবং কিং সউদ ইউনিভার্সিটির মতো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে দেশটিতে।
৭. ইন্দোনেশিয়া
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া। তবে দেশটি তার বহুসাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সহনশীলতার জন্য সুপরিচিত। ছয়টি দাপ্তরিক ধর্মকে স্বীকৃতি দেওয়া এই দেশে ১ হাজার ৩০০টির বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
গ্লোবাল মুসলিম ট্রাভেল ইনডেক্সে মালয়েশিয়ার পাশাপাশি অন্যতম শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
৮. সংযুক্ত আরব আমিরাত
প্রায় ২০০ দেশের নাগরিকের আবাস্থল সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাণিজ্য ও প্রযুক্তির প্রধান বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার পাশাপাশি এটি বিশ্বব্যাপী হালাল ট্যুরিজমে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দুবাইয়ের প্রযুক্তি অঞ্চল ‘দুবাই ইন্টারনেট সিটি’সহ দেশটিতে পড়ালেখার পাশাপাশি পড়াশোনা-পরবর্তী ক্যারিয়ার গড়ার বড় সুযোগ রয়েছে।
৯. সিঙ্গাপুর
অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে মুসলিমবান্ধব তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। ইসলামিক ধর্মীয় কাউন্সিল অব সিঙ্গাপুরের (এমইউআইএস) অনুমোদিত হালাল খাবার এখানে সহজেই পাওয়া যায়। দেশটির কঠোর বর্ণ ও ধর্মীয় বৈষম্যবিরোধী আইনের কারণে যেকোনো ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারেন।
১০. তুরস্ক
ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্কের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৯.৮ শতাংশ মুসলিম। এখানকার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ইংরেজি মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। সরকারি সংস্থা ‘দিয়ানেত’-এর মাধ্যমে দেশজুড়ে ধর্মীয় অবকাঠামো তদারকি করা হয়।
১১. কাতার
সংবিধান অনুযায়ী কাতারের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। শিক্ষার প্রসারে ‘এডুকেশন সিটি’র অধীনে দেশটির নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়া মেলন বা জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বখ্যাত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসগুলোতে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত উপার্জনে করমুক্ত সুবিধা থাকায় দেশটি শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়।
১২. ওমান
ওমানের সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটি মক্কার দিক বিবেচনা করে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ভবনে নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে জীবনযাত্রার খরচ বেশ কম, ফলে এটি আন্তর্জাতিক মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক একটি গন্তব্য।
মুসলিম শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা
আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিলের (সিএআইআর) রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক অভিযোগ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে সংস্থাটি রেকর্ড ৮ হাজার ৬৮৩টি বৈষম্যের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে, যা বিগত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামোফোবিয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বর্ণবাদ বা বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলে নিরাপদ পরিবেশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এমন দেশ নির্বাচন করা আন্তর্জাতিক মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য এখন অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: স্টাডি ইন্টারন্যাশনাল
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


