বিতর্ক মঞ্চ থেকে গবেষণাগারে রেবেকা শাফির পথচলা

বিতর্ক মঞ্চ থেকে গবেষণাগারে রেবেকা শাফির পথচলা

নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশনের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় যুক্তি ও সাবলীল বক্তব্য দিয়ে দর্শকদের নজর কেড়েছিলেন যে কিশোরী, তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের গবেষক। পদার্থবিজ্ঞান থেকে কৃষ্ণগহ্বর, এরপর মানুষের মস্তিষ্ক ও জিনের রহস্য অনুসন্ধান—বিজ্ঞানের একাধিক শাখায় তার পথচলা অনন্য।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এক কিশোরীর বক্তব্য একসময় নতুন করে আলোচনায় আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যুক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাবলীল উপস্থাপনায় দর্শকদের মুগ্ধ করা সেই কিশোরীর নাম রেবেকা শাফি। বিতর্কের মঞ্চে পরিচিতি পাওয়া এই নারী পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাজগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

বিজ্ঞাপন

রেবেকার শিক্ষাজীবনের শুরু বাংলাদেশে। নিজের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে তিনি জানিয়েছেন, একই সময়ে বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পদ্ধতির পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ও লেভেল ও এ লেভেল সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি তাকে যুক্তরাজ্যের দুই স্তরের শিক্ষাক্রমও অনুসরণ করতে হয়েছে।

পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলজীবনেই বিতর্কে দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। ১৯৯৩-৯৪ সালের বিটিভি আয়োজিত জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। তাঁর পুরোনো বিতর্কের ভিডিও কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে পরিচিতি পান রেবেকা। ভিডিওটির পরিচয় ও সময়কাল নিয়ে রিউমর স্ক্যানারের একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনেও তথ্য পাওয়া যায়।

ক্যালটেক থেকে হার্ভার্ড

স্কুলজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান রেবেকা। ভর্তি হন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য বিশ্বের পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ক্যালটেক থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তার শিক্ষাজীবনসংক্রান্ত একটি পুরোনো জীবনবৃত্তান্তে স্নাতক পর্যায়ে ৪.০০-এর মধ্যে ৪.০০ জিপিএ পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

এরপর উচ্চতর গবেষণার জন্য ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন তিনি। তার গবেষণার বিষয় ছিল কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণন। কৃষ্ণগহ্বর কত দ্রুত ঘোরে, তা নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন তিনি। এ গবেষণায় তার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী রমেশ নারায়ণ ও জেফরি ম্যাকক্লিনটক।

হার্ভার্ডের ইনস্টিটিউট ফর থিওরি অ্যান্ড কম্পিউটেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে তাত্ত্বিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে সেরা গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া এরিক আর. কেটো পুরস্কার যৌথভাবে পান রেবেকা শাফি ও ম্যাট ম্যাককুইন। রেবেকার পিএইচডি গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘মেজারিং ব্ল্যাক হোল স্পিন’।

মহাকাশ থেকে মানুষের মস্তিষ্কের গবেষণায়

পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর গবেষণা শেষ করার পর রেবেকার গবেষণার ক্ষেত্র বদলে যায়। মহাকাশের কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নিয়ে কাজ করা এই গবেষক আগ্রহী হয়ে ওঠেন মানুষের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও জিনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ব্রেইন সায়েন্সে সোয়ার্টজ ফেলো হিসেবে স্নায়ুবিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেন তিনি। পরে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ব্রড ইনস্টিটিউট অব এমআইটি অ্যান্ড হার্ভার্ডে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রমের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের প্রকাশিত তাঁর পরিচিতি এবং এনআইএমএইচের তথ্য অনুযায়ী, রেবেকা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের (এনআইএমএইচ) ডেভেলপমেন্টাল নিউরোজেনোমিকস বিভাগে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন।

তার বর্তমান গবেষণার অন্যতম বিষয় মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রমে জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভূমিকা। বিশেষ করে নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্যের পেছনে জিনের ভূমিকা কী, তা অনুসন্ধান করছেন তিনি। এ কাজে নিউরোইমেজিং, পরিসংখ্যানভিত্তিক জেনেটিক বিশ্লেষণ এবং বৃহৎ পরিসরের গবেষণাতথ্য ব্যবহার করা হয়।

বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে গবেষণা প্রকাশ

রেবেকার গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য কাজ প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ। ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই গবেষণাপত্রের শিরোনাম ‘এ সেক্স-স্ট্র্যাটিফায়েড অ্যানালাইসিস অব দ্য জেনেটিক আর্কিটেকচার অব হিউম্যান ব্রেইন অ্যানাটমি’। এতে মানুষের মস্তিষ্কের গঠনগত বৈশিষ্ট্যে নারী ও পুরুষের মধ্যে জিনগত প্রভাবের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের বৃহৎ তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে মস্তিষ্কের এক হাজারের বেশি গঠনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখতে চেয়েছেন, নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের গঠন এবং এসব বৈশিষ্ট্যের ওপর জিনগত প্রভাব কতটা এক বা ভিন্ন। রেবেকা শাফি এ গবেষণার অন্যতম লেখক।

এ ধরনের গবেষণা মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনগত পার্থক্য বোঝার পাশাপাশি বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জিনগত ভিত্তি অনুসন্ধানেও ভূমিকা রাখতে পারে।

বিজ্ঞানের প্রতি কৌতূহলই বড় শক্তি

রেবেকা শাফির পথচলার বিশেষ দিক হলো, তিনি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের গবেষণা সীমাবদ্ধ রাখেননি। পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে শুরু করে কৃষ্ণগহ্বরের মতো মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। পরে সেই অভিজ্ঞতা ও গণিতভিত্তিক বিশ্লেষণী দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রবেশ করেছেন স্নায়ুবিজ্ঞান ও মানব জেনেটিকসের জটিল গবেষণায়।

তার শিক্ষাজীবন ও গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায়, বিজ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ, নতুন বিষয় শেখার মানসিকতা এবং গবেষণার ধারাবাহিকতা তাঁর পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের শিক্ষা পদ্ধতির পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের শিক্ষাক্রম শেষ করা থেকে শুরু করে ক্যালটেক ও হার্ভার্ডে পড়াশোনা—প্রতিটি ধাপেই ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ।

নব্বইয়ের দশকে বিটিভির বিতর্ক প্রতিযোগিতায় যে কিশোরী যুক্তির শক্তিতে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে মহাকাশ থেকে মানবমস্তিষ্ক পর্যন্ত। রেবেকা শাফির এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বিজ্ঞানচর্চায় কৌতূহল, অধ্যবসায় ও জ্ঞান অর্জনের সীমাহীন আগ্রহেরও উদাহরণ।

সূত্র: রেবেকা শাফির ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট, যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএমএইচ, ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস সাউথওয়েস্টার্ন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, নেচার কমিউনিকেশন্স, রিউমর স্ক্যানার ও বাসস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন