শুরু করলেন অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। সাদা-কালো ছবিতে মুখের উপর লিখলেন ৯; আপলোড করলেন ফেসবুকে। এই ছবির মানে, প্রতিদিন গড়ে ৯টি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন তিনি। নম্বর দিয়ে এমন প্রতিবাদের ধরন শুধু দেশেই নয়; বিশ্বেও বেশ নতুন। এই প্রতিবাদের শুরুটা ঠিক কবে, কখন, কার মাধ্যমে এবং কোন ঘটনার ভিত্তিতে, সেটির খোঁজ মিলছে না। তবে ২৫ নভেম্বর তারকাদের মধ্যে সবার আগে এই পোস্ট দিয়েছিলেন অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা।
এরপর এটি বারুদের মতো অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়ে আলোচিত অভিনেত্রী শবনম ফারিয়ার পোস্ট থেকে। এরপর থেকে একই ক্যাপশনে নারী শিল্পীরা এই প্রচার জারি রেখেছেন। যার সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত হচ্ছেন সাধারণরাও। প্রতিটি পোস্টে প্রায় একই ক্যাপশন ও হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছেন প্রতিবাদীরা। যাতে লেখা, ‘নম্বর থেকে কণ্ঠে—চলুন, আমাদের গল্প শোনাই। মানুষ শুধু একটি সংখ্যা দেখতে পারে, কিন্তু আমি দেখি আমার সব সহ্য করা যন্ত্রণা আর সব জয় করা লড়াই। আপনার সংখ্যাটিও শেয়ার করুন—ডিজিটাল সহিংসতার বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়াই। হ্যাশট্যাগে লেখা হয়, আমার নম্বর আমার গল্প। কেউ হাতে, কেউ মুখে, কেউ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শরীরের ওপর বিভিন্ন নম্বর লিখে ছবি প্রকাশ করছেন।
প্রথম দেখায় যেন রহস্যজনক কোনো ট্রেন্ড, কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে এটি আসলে ডিজিটাল ভায়োলেন্স বা অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিবাদ। তারকাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সহিংসতা এখন আর শুধু মানসিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্যারিয়ার ধ্বংস, সামাজিক সম্পর্ক ভাঙন, আত্মসম্মানহানি, এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতির ঘটনাও ঘটছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা আইনি আশ্রয় নিতে ভয় পান লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপের কারণে।
অভিনেত্রী রুনা খান তার ছবি পোস্ট করে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার সংখ্যা ২৪। আজ আমি যতটা হয়রানি মন্তব্য পেয়েছি, এ সংখ্যাই এটি। কেউ হয়তো এটাকে শুধু একটি সংখ্যা মনে করবেন; কিন্তু আমার জন্য এটা হলো প্রতিটি মুহূর্ত, যা আমি সহ্য করেছি, প্রতিটি ক্ষত, যা আমি বহন করেছি এবং সেই প্রতিটি পদক্ষেপ, যা আমাকে এগিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এবার তোমার সংখ্যা বলো।’ এই আন্দোলনের মাধ্যমে তারকারা মূলত তিনটি বার্তা দিতে চাইছেন—অনলাইন হয়রানি কোনো ‘তুচ্ছ বিষয়’ নয়, এটি একটি গুরুতর অপরাধ। ভুক্তভোগীরা একা নন এবং ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি।
এই প্রতীকী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন নীরবতা ভাঙা। এতদিন যারা ব্যক্তিগতভাবে হয়রানির শিকার হয়েও চুপ থেকেছেন, তারা এখন কথা বলার সাহস পাচ্ছেন। অনেক সাধারণ মানুষও তারকাদের অনুসরণ করে নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ শুরু করেছেন। কমেন্ট বক্সে ভেসে উঠছে ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতার গল্প—ফেক ভিডিও, ব্যক্তিগত ছবি ফাঁসের হুমকি, অশ্লীল বার্তা, অবিরাম স্টকিং। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার ট্রাইব্যুনাল থাকলেও বাস্তবতায় বিচার প্রক্রিয়া এখনো জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক ভুক্তভোগী মামলা করেও দ্রুত প্রতিকার পান না। তারকারা তাই একদিকে আইনের কঠোর প্রয়োগের দাবি তুলছেন, অন্যদিকে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন; কারণ ট্রলিং, মিথ্যা অপপ্রচার ও সাইবার বুলিং কেবল আইনি নয়, নৈতিক সমস্যাও।

