পাবনার চিত্র

ঘাসের সংকটে দুধ উৎপাদন অর্ধেক, বিপাকে খামারিরা

ঘাসের সংকটে দুধ উৎপাদন অর্ধেক, বিপাকে খামারিরা

পাবনার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা ও চরাঞ্চলের খামারিদের জন্য বর্ষা চরম দুর্ভোগের নাম। বছরের এ সময় একদিকে পশুখাদ্যের তীব্র সংকট, অন্যদিকে গাভীর দুধ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসায় লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজারো খামারি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষা ও ভারি বৃষ্টিতে নিচু এলাকার ঘাসের জমি তলিয়ে যাওয়ায় সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে।

খামারিরা জানান, টানা তিন মাস কাঁচা ঘাসের জমি পানির নিচে থাকায় বাধ্য হয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে শুকনো খড় ও ভুসি কিনে গবাদি পশু পালন করতে হচ্ছে। দানাদার খাদ্যের পরিমাণ বাড়ালেও কাঁচা ঘাসের অভাব পূরণ না হওয়ায় গাভীর দুধ উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। সাধারণ সময়ে যে গাভি প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ লিটার দুধ দেয়, বর্ষা মৌসুমে তা নেমে আসে ১০ থেকে ১২ লিটারে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে পশুখাদ্যের দামও লাগামহীনভাবে বেড়েছে। প্রতি মণ খড় কিনতে হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকায়। ফলে প্রতিটি গবাদি পশুর পেছনে দিনে ব্যয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিক্রি থেকে খামারিদের আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।

ক্রমবর্ধমান লোকসান ও ঋণের চাপ সামাল দিতে অনেক খামারি শেষ সম্বল বাছুর কিংবা গবাদি পশু বিক্রি করে খড়-ভুসি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সহায়তা না মিললে পাবনার দুগ্ধ খাতের অনেক ছোট ও মাঝারি খামার বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

বেড়া উপজেলার দক্ষিণ চর পেচাকোলা গ্রামের বকুল প্রামাণিক বলেন, তিনটি গাভি থেকে দিনে প্রায় ৪০-৫০ লিটার দুধ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ২০-২৫ লিটার দুধ পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।

উপজেলার চর নাকালিয়া গ্রামের ডেইরি খামারি ইব্রাহিম জানান, চার বিঘা জমিতে ঘাসের চাষ করে খামারে দিতেন তিনি। সেগুলো বর্ষা ও টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে। ফলে দুধ উৎপাদনও কমে গেছে। ৫০ লিটারের বিপরীতে এখন দুধ মিলছে মাত্র ২০ থেকে ২২ লিটার।

তিনি আরো বলেন, একটি গাভিকে দিনে ৫০০ টাকার মতো কেনা খাবার দিতে হয়। সেই গাভির দুধ বিক্রি করে ৪৫০ টাকার মতো পাওয়া যায়। ফলে দুধ উৎপাদনে এখন আসল টাকাও উঠে আসছে না।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাবনায় প্রায় ১০ হাজার নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দুগ্ধ খামার রয়েছে, যেখান থেকে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৪ লাখ টন দুধ উৎপাদন হয়। তবে বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও চাটমোহরের মতো নিচু ও চরাঞ্চলে থাকা খামারগুলোর সিংহভাগই এই তিন মাস কাঁচা ঘাসের তীব্র সংকটে ভোগে। বিশেষ করে ফরিদপুর উপজেলার ১ হাজার ৫০০টির বেশি খামারের প্রায় ৬০ শতাংশই বর্ষায় এই অচলাবস্থায় পড়ে।

দুধ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও খোলাবাজারে। এ ব্যাপারে বেড়ার নাকালিয়া এলাকার ঘোষ মতলব প্রামাণিক বলেন, বর্ষার তিন মাসে দুধ অনেক কমে যায়। স্বাভাবিক সময়ে সাধারণত ৪০ কেজির ১২-১৩ ক্যান দুধ বিভিন্ন খামার থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন চিলিং সেন্টারে দিতাম। কিন্তু এখন পাচ্ছি সর্বোচ্চ সাত-আট ক্যান।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘বড় খামারিদের আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিই। এক্ষেত্রে তারা সাইলেজ পদ্ধতিতে ঘাস সংরক্ষণ করে। যেটি বর্ষা মৌসুমে তারা ব্যবহার করেন। তবে বর্ষার এই কয়েক মাসে খামারিদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা সরকারিভাবে দেওয়া যায় কি না, সেটি ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন