ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী সম্পর্কের ইতিহাস সাত দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও ব্রিটেন ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। তেলশিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়াই পশ্চিমা শক্তিগুলোর বিরোধিতার অন্যতম কারণ ছিল। এর পর প্রায় ২৫ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও শাহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকে।
তবে শাহের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে রূপ নেয়। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহের পতন ঘটে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়। একই বছর ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন আমেরিকানকে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখে।
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন বারবার তেহরান সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।
ইরাক–ইরান যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে দুই দেশের উত্তেজনা বেড়েছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি হলেও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরবর্তীতে ইরানও চুক্তির সীমা অতিক্রম করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করে।
তবে, ইরান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গুয়াতেমালা ও কিউবা থেকে শুরু করে চিলি ও ভেনেজুয়েলা-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে এমন সব সরকারের বিরুদ্ধে বারবার হস্তক্ষেপ করেছে, যাদের তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য প্রতিকূল বলে মনে করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ফল মিশ্র হয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা হলেও পরে ব্যাপক প্রাণহানি ও অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। আফগানিস্তানে ২০ বছর অবস্থানের পর ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করলে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করে। ২০১১ সালে লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হলেও দেশটি এখনো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত।
শীতল যুদ্ধের সময় লাতিন আমেরিকায়ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা নেয়। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালা, ১৯৬৪ সালে ব্রাজিল এবং ১৯৭৩ সালে চিলিতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত হস্তক্ষেপ ও অভ্যুত্থানের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, স্বৈরশাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো—একটি সরকারকে উৎখাত করা যতটা সহজ, তার পরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা ততটা সহজ নয়। ইরানের ক্ষেত্রে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান স্বল্পমেয়াদে শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে আরো শক্তিশালী করে, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অন্যতম রাজনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটনের উচিত নির্দিষ্ট সামরিক বা পারমাণবিক সক্ষমতা মোকাবিলা এবং একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যে পার্থক্য করা। ইতিহাস দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে সরকার পরিবর্তন করা গেলেও এর পরিণতি সব সময় কাঙ্ক্ষিত হয় না।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


