যেভাবে পলাশী আসে

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান

যেভাবে পলাশী আসে
পলাশি যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ

শেষ পর্ব: পনেরো শতকে গণেশের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার প্রায় একশ বছর পর ষোলো শতকের শুরুতে আলাউদ্দীন হোসাইন শাহর শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯) সিলেটের গৌরাঙ্গ নবদ্বীপের চৈতন্য পরিচয়ে ১৫০৬ সাল থেকে হিন্দু সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন শুরু করেন। বর্ণহিন্দুদের জুলুম-অত্যাচারের মুখে ‘অবর্ণ-অচ্ছুৎ’গণের দলে দলে ইসলাম কবুল করা ঠেকানোর জন্য তিনি হিন্দু ধর্ম রক্ষার জন্য ‘অবতার’রূপে আবির্ভূত হন। ‘সংস্কৃত পাণ্ডিত্যের কেন্দ্রভূমি’ নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে তিনি হিন্দু ধর্ম রক্ষার বিচিত্র ‘কৌশল’ গ্রহণ করেন। তিনি ‘হিন্দু’ সমাজে জাতিভেদের দেয়াল ভাঙার নামে ‘প্রেম ও ভক্তি’র বাণী প্রচার করেন। অন্য পিঠে তিনি ‘পাষণ্ডী’ মুসলমান ‘সংহারে’র ঘোষণা প্রচার করেন। তিনি বলেন : ‘পাষণ্ডী সংহারীতে মোর, এই অবতার। / পাষণ্ডী সংহারী ভক্তি করিমু প্রচার।’ (শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, আদি লীলা, পৃ. ১২০)

বাংলায় তখন মুসলমান ছাড়া বেদ অমান্যকারী কোনো সমাজ ছিল না। চৈতন্য এই মুসলমানদের ‘যবন’, ‘ম্লেচ্ছ’, ‘কলিকালের যবন’ ইত্যাদি বিশেষণ দিয়ে এই ‘মহাদুরাচারী’দের সংহারের আওয়াজ তুলে তাদের বিরুদ্ধে সব ‘হিন্দু’কে সাংস্কৃতিক একজাতিত্বের আদর্শে এক হওয়ার আহ্বান জানান। চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলনের অন্যতম কৌশল হিসেবে মুসলমানদের দ্বারা হিন্দু নির্যাতনের বহুবিচিত্র কল্পকাহিনি তৈরি করে সেগুলো প্রচার করে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া হয়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দিতে চৈতন্য স্বয়ং নবদ্বীপের কাজী বা প্রধান বিচারপতির বাড়িতে তার সমর্থকদের নিয়ে হামলা চালান। এটিকে উপমহাদেশে প্রথম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা মনে করা হয়। (আবদুল মান্নান তালিব : বাংলাদেশে ইসলাম, পৃ. ২২৭)

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি ছাড়া চৈতন্যের আন্দোলনকে যুবক-যুবতীদের কাছে ঝাঁজালো করার দ্বিতীয় কৌশল ছিল ‘রজকিনী প্রেমের আদিরস’ সঞ্চার। পথে পথে যুবক-যুবতীদের সংকীর্তন ও নগর কীর্তনের নামে আবেগ উদ্বেলিত বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল ও মৃদঙ্গ বাজিয়ে, পতাকা উড়িয়ে নৃত্যগীতসহ রাজপথ প্রদক্ষিণ বা পদযাত্রার আয়োজন করে চৈতন্য তাদের কিশোর কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার লাস্যলীলার প্রেমোচ্ছ্বাসের আবেশে যুক্ত করেন। চৈতন্য নিজেও সেই উচ্ছ্বাসে উন্মাদ হয়ে কখনো কখনো সংজ্ঞা হারাতেন। চৈতন্যের আন্দোলনে এভাবে সাম্প্রদায়িকতা আর স্বকীয়া প্রেমের ওপর পরকীয়াকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসবই ছিল হিন্দু যুবক-যুবতীদের ইসলাম থেকে দূরে রাখার জন্য। (আবদুল মান্নান তালিব : বাংলাদেশে ইসলাম, পৃ. ২২৭, ২২৯-২৩০) চৈতন্যের এই কৌশল সফল হয়েছে মনে করে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় লিখেছেন : ‘শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব না হলে জাতিভেদের জন্যই কিছু উঁচু বর্ণের হিন্দু ছাড়া সবাই মুসলমান হয়ে যেত।’ [কাজী আমিনুল ইসলাম (উদ্ধৃত) : বাংলার রূপরেখা, কলকাতা] রমেশচন্দ্র মজুমদারও এই লাভটাকে বড় করে দেখে লিখেছেন, মুসলিম শাসনের তিনশ বছরে অন্য কারো দ্বারা, যা সম্ভব হয়নি চৈতন্যের নেতৃত্বে ‘সেই অসম্ভব সম্ভব হইল’। (রমেশচন্দ্র মজুমদার : বাংলাদেশের ইতিহাস : মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ২৬১)

তবে মোহাম্মদ আকরম খাঁ এ সম্পর্কে লিখেছেন : ‘বৌদ্ধ সমাজ ও বৌদ্ধ ধর্ম্মকে তাহাদের মাতৃভূমি হইতে সমূলে উৎখাত করার পর তাহাদের নেক নজর পড়িয়াছিল মুছলমান সমাজের উপর। তাই যুগপৎভাবে তাহারা চেষ্টা করিতে লাগিলেন ‘যবন রাজাদিগকে’ রাজনৈতিক কৌটিল্যের মাধ্যমে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত করিয়া ফেলিতে।...ইহাই ছিল তৎকালের অবতার ও তাঁহার ভক্ত ও সহকারীদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য।’ (মোহাম্মদ আকরম খাঁ : মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, ১ম সংস্করণ, নভেম্বর, ১৯৬৫, পৃ. পৃ. ১০০-১০২, ১১০)

চৈতন্যের মৃত্যুর পরও চৈতন্যবাদী বৈষ্ণব সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন বহুদিন, বিশেষ করে নবদ্বীপে অব্যাহত থাকে। বৈষ্ণব সাহিত্যের আদিরস সমাজে মারাত্মক কুপ্রভাব ছড়ায়। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার এ সাহিত্যের নমুনা হিসেবে গীতগোবিন্দের রাধা-কৃষ্ণের কামকেলীর উল্লেখ করে লিখেছেন : গীতগোবিন্দের বারোতম অধ্যায়ে রাধা-কৃষ্ণের কামকেলীর যে রগরগে বর্ণনা রয়েছে এখনকার কোনো গ্রন্থে থাকলে আদালতে দণ্ডনীয় হতো। এ প্রসঙ্গে বৈষ্ণব সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ ডক্টর বিমলবিহারী মজুমদার চন্ডিদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’-এর নজির তুলে ধরে লিখেছেন, এই গ্রন্থে যে আদি রসের ছড়াছড়ি, সেটিকে শুধু ‘পর্নোগ্রাফির পর্যায়ভুক্ত’ বলা যায়।

বৈষ্ণব সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে চৈতন্যের আন্দোলনের এই নোংরা ও কদর্য বিষয়গুলো হিন্দু সমাজের সীমানা ছাড়িয়ে মুসলিম সমাজেও গভীর ও সুদূরপ্রসারী ক্ষত তৈরি করে। বৈষ্ণব আন্দোলনের প্লাবনে মুসলমানদের শালীন সাংস্কৃতিক আচার এমনকি অনেকের সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাস ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়। এ সময় মুসলমানদের কোনো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন না থাকায় বা গড়ে না ওঠায় মুসলমান সমাজ সাংস্কৃতিকভাবে দুর্বল ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। আত্মবোধহীন একশ্রেণির মুসলমান কবিও চৈতন্যের বৈষ্ণব চিন্তা ও ভাবধারার সয়লাবে এ সময় ভেসে যান। যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য এদেরকেই ‘বাঙ্গালার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি’ বলেছেন।

মুসলিম সমাজের এ অবস্থার দায় মুসলিম শাসকরা এড়াতে পারেন না। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলিম শাসকদের হাত ধরে বাংলা ভাষা বিলীন হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। মুসলিম সুলতানরা বাংলা ভাষাকে রাজ দরবারে মর্যাদা দিয়েছিলেন। স্বাধীন সুলতানি আমলের শেষদিকের মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্য, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থ মৃতপ্রায় সংস্কৃত থেকে বাংলায় তরজমা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে হিন্দু ঐতিহ্যের শক্তিশালী ধারা তৈরি করতে মুসলিম শাসকরাই পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এজন্য হিন্দু কবিদের বিস্তর প্রশংসাও পেয়েছেন। তবে সে সময় দুনিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ আরবি ভাষায় ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, দর্শন, তর্কবিদ্যা, কাব্য, সাহিত্য, তাফসির, হাদিস, উসুল বিষয়ে যে বিশাল জ্ঞান-ভান্ডার মজুত ছিল, সেগুলো মুসলিম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন গঠনের জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল। কিন্তু তখনকার মুসলিম শাসকরা সেসব মুসলিম ঐতিহ্যভিত্তিক সাহিত্য বাংলা ভাষায় প্রকাশের উদ্যোগ নেননি। রাষ্ট্র গঠনের পাশাপাশি জাতি গঠনে এই মুসলিম শাসকরা সচেতন ছিলেন বলা যায় না। অতীতের বৌদ্ধ পাল শাসকদের সাংস্কৃতিক অসচেতনতার কারণে বাংলায় বৌদ্ধ সভ্যতার অস্তিত্ব অতীত কাহিনিতে পরিণত হওয়া থেকেও বাংলার শেষ দিকের মুসলিম সুলতানরা শিক্ষা নেননি।

সুলতান আলাউদ্দীন হোসায়েন শাহ নিজেই শুরুতে চৈতন্যের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। চৈতন্যের দুই শিষ্য রূপ গোঁসাই ও সনাতন গোঁসাইকে তিনি তার দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়েছিলেন। চৈতন্যের আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে এই গোঁসাইরা রাজ্যময় সাম্প্রদায়িক অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে সুলতানকে উৎখাতের চেষ্টা করেন। এ সময় বাংলার কিছু আলেম সুলতানকে সতর্ক করেন। এ সম্পর্কে মোহাম্মদ আকরম খাঁ লিখেছেন : ‘ছোলতান হোসেনের প্রাথমিক দোষ-দুর্বলতার সুযোগ লইয়া, গৌড় রাজ্যের সাধু-সন্ন্যাসীরূপী বৈষ্ণব জনতা বাংলাদেশ হইতে ইসলাম ধর্ম ও মোছলেম শাসনকে সমূলে উৎখাত করিয়া ফেলিবার জন্য যে গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, ছোলতান ও স্থানীয় মোছলেম নেতাদের যথাসময়ে সতর্ক হওয়ার ফলে তাহার অবসান ঘটিয়া যায়।’ (মোহাম্মদ আকরম খাঁ : মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১১০)

জনগণের সাংস্কৃতিক জীবন গঠনে তখনকার মুসলিম শাসকদের অসচেতনতা ও অদূরদর্শিতার জন্য পরবর্তী অন্তত ২০০ বছর বাংলার মুসলমানদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলনের কেন্দ্র নবদ্বীপ থেকেই পরে ১৬৯০ সালে ইংরেজ বণিক জোব চার্ণক বাংলাকে পলাশীর পরিণতির দিকে পরিচালনা করেন।

তিন. এক হাতে বাইবেল, অন্য হাতে তরবারি

ষোলো শতকের শুরুতে আলাউদ্দীন হোসাইন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯) সময় চৈতন্যের সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানের কাছাকাছি সময়ে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দ্য গামা ১৪৯৮ সালের ২০ মে হিন্দুস্তানের মালাবার উপকূলে পৌঁছান । তখন ছিল দিল্লির লোদি সুলতানদের শাসনামল (১৪৫১-১৫২৬ খ্রি.)। সাগরের বাণিজ্যে কর্তৃত্বকারী আরব মুসলিম বণিকরা ভাস্কো দ্য গামাকে বাধা দেন। তবে কিন্তু কালিকটের হিন্দু রাজা জামুরিন তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং তার প্রাসাদে ছয় মাস মেহমানদারি করেন।

ভাস্কো দ্য গামা ছয় মাস পর জামুরিনের চিঠি নিয়ে পর্তুগালে যান। ১৫০২ সালে তিনি আবার মালবার উপকূলে ফেরেন। ভাস্কো দ্য গামার পিছে পিছে ১৫০৫ সালে মালাবার আসেন পর্তুগিজ নাবিক ফ্রান্সিককো দ্য আলমেডিয়া। তার সঙ্গে ছিল দেড় হাজার লোক-লশকর। তার পরে ১৫০৯ সালে এলেন আল ফানসো দ্য আল বুকার্ক। তিনি ১৫১০ সালে গোয়া দখল করে হিমালয়ান উপমহাদেশে ইউরোপীয়দের প্রথম কলোনি গড়ে তোলেন। ষোলো শতকের শুরু থেকেই মালাবার উপকূলকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় পর্তুগিজদের শক্তি সমাবেশ ঘটতে থাকে। পর্তুগিজরা মালাবার উপকূলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন। সাগরে বিভিন্ন বাণিজ্য জাহাজে এবং হজযাত্রীদের জাহাজে হামলা ও লুটপাট চালান। ১৫১৫ সালের মধ্যে তারা ‘তরবারি’র জোরে হিন্দুস্তানের দক্ষিণ উপকূলের কোচিন-দমন-দিউর মতো কিছু ছোট জায়গায় সামরিক এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম করেন। আর হিন্দুস্তানের স্থলভাগে বিভিন্ন এলাকায় তারা বাইবেল প্রচারের জন্য গির্জা কায়েম করেন।

এগারো-বারো-তেরো শতকে ‘পবিত্র ভূমি’ উদ্ধার এবং মুসলমানদের অগ্রগতি ঠেকানোর আওয়াজ তুলে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদী খ্রিষ্টানরা ধর্মযুদ্ধের নামে খ্রিষ্টান শক্তিকে ‘ক্রস’-এর পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেন। এই যুদ্ধকে তারা ‘ক্রুসেড’ নাম দেন। তাদের আগ্রাসী হামলার মোকাবিলায় মুসলমানরা ‘ক্রিসেন্ট’ বা বাঁকা চাঁদখচিত নিশানের নিচে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন। ১০৯৫ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত ৩০০ বছর ক্রস ও ক্রিসেন্টের লড়াইয়ে ১০৯৫ থেকে ১১৪৪ সাল পর্যন্ত প্রথম ৫০০ বছর খ্রিষ্টান শক্তি জয়ের পথে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে মুসলিম শক্তির বিজয়ের নিশান সামনে অগ্রসর হয়। এই ক্রুসেডে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী তীব্র লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টান শক্তির পরাজয়ের স্মৃতি নিয়ে ইউরোপীয়দের চরম মুসলিমবৈরী মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। সেই মানসিক পটভূমিতে ইউরোপীয়রা মুসলমানদের হিন্দুস্তান নামক সালতানাতে প্রবেশ করেন।

ক্রুসেডের শেষদিকে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে। চেঙ্গিস খানের বংশধর তাতারি বা মোঙ্গলরা মধ্য-এশিয়ায় হামলা চালান। খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা তখন নানা কৌশলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মোঙ্গলদের উসকানি দেন। মোঙ্গলরা পারস্যের কেন্দ্র পারসেপোলিস বা তাখতে জামশীদ ধ্বংস করেন। তারা দিল্লির মামলুক সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশের (১২১০-৩৬) সময় হিন্দুস্তানের মুসলিম সাম্রাজ্যে হামলা করলে সুলতান ইলতুতমিশ উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গলদের দৃঢ়ভাবে রুখে দেন। হালাকু খানের বাহিনী ১২৫৬-৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফতের কেন্দ্র বাগদাদ ধ্বংস করে মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশাল ভান্ডার নিশ্চিহ্ন করে। তাতারিরা এরপর সিরিয়ায় দামেস্কের সদর দরোজায় কড়া নাড়ে। মুসলিম খিলাফতের কেন্দ্র তখন ইরাক থেকে মিসরে এবং এরপর তুরস্কে সরে যায়। এভাবে মধ্য-এশিয়ায় মুসলমানদের একের পর এক শক্তিকেন্দ্র তাতারি হামলায় বিপর্যস্ত হওয়ার পর মুসলিম জাহানে দিল্লির শাসনকেন্দ্রটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মধ্য এশিয়ার বহু মুসলমান এ সময় বাংলাসহ হিন্দুস্তানের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় হিজরত করেন। মধ্য এশিয়ায় এই মহাভাঙনের সময় চৌদ্দ শতকের বাংলা ইসলাম প্রচারক আলেমদের একটি বড় কর্মকেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পনেরো শতক পর্যন্ত ইসলাম প্রচারের এই শক্তিশালী ধারা অব্যাহত থাকে। ষোলো শতকে সেই গতি কমতে থাকে।

ভাস্কো দ্য গামার মালাবারে আসার প্রায় ১০০ বছর পরে সতেরো শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে উত্তমাশা অন্তরীপের পুবদিকের সব এলাকায় একচেটিয়া ব্যবসা করার অধিকারের সনদ দেন। তাদের পর ১৬০২ সালে ডাচ, ১৬০৪ সালে ফরাসি, ১৬১২ দিনেমার, ১৬৩৩ সালে স্পেনের বণিকরা এদিকে আসেন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের ইংরেজ খ্রিষ্টান সিভিলিয়ান কর্মকর্তা উইলিয়াম হান্টার এ এলাকায় আগমনকারী সে-কালের ইউরোপীয়দের জাতীয় মানসিকতা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ মন্তব্য করেছেন। ১৮৬৮ সালে হান্টার লেখেন : এই ইউরোপীয় বণিকরা নিজ দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনশ বছরের ক্রুসেডের পটভূমিতে চরম মুসলিম বৈরী মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। তারা সেই মনস্তত্ত্ব নিয়েই এদিকে আসেন। ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ এসব ইউরোপীয় কোম্পানির লোকদের সম্পর্কে হান্টার স্পষ্ট করে লিখেছেন : ‘They were not traders, but Knight-errant and Crusaders... Their national temper had been formed in their contest with the Moors (Muslims) at home.’Ñঅর্থাৎ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ সেকালে এদেশে আগমনকারী ইউরোপীয়রা আসলে ‘বণিক’ ছিলেন না। তারা মূলত ছিলেন ‘নাইট-এরেন্ট’ বা দুঃসাহসিক বীরব্রতী অভিযাত্রী ও ‘ক্রুসেডার’। নিজেদের দেশে মুর বা মুসলমানদের সঙ্গে তাদের (স্বসৃষ্ট) দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের জাতীয় মানস বা মেজাজ বিশেষভাবে গঠিত হয়েছিল। (W. W. Hunter: A Brief History of the Indian People, 1868, p-167)। মারিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারিতে ‘knight-errant’-এর মানে বলা হয়েছে : ‘a knight travelling in search of adventures in which to exhibit military skill, prowess …। সেখানে ‘Crusader’ -এর পরিচয় বলা হয়েছে : ‘a person who participated in any of the military expeditions undertaken by Chirstian powers in the 11th, 12th and 13th centuries to win the Holy Land from the Muslims.’

হান্টারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সে সময় ব্যবসায়ের নামে এই ইউরোপীয় খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদীরা ‘নাইট-এরেন্ট’ বা দুঃসাহসিক বীরব্রতী অভিযাত্রী ‘ক্রুসেডার’রা ‘এক হাতে বাইবেল আর অন্য হাতে তরবারি’ নিয়ে মুসলিমশাসিত হিন্দুস্তানে আসেন। সাধারণভাবে মুসলমান এবং বিশেষভাবে মুসলিম শাসনের ব্যাপারে তাদের ছিল প্রচণ্ড বৈরী মনোভাব। তাদের এই মনস্তত্ত্ব এখানে ব্যবসায়ের কেন্দ্র নির্বাচন এবং দোভাষী ও ব্যবসায়িক পার্টনার নিয়োগসহ তাদের সব কাজকে প্রভাবিত করে। ‘খ্রিষ্টের রাজ্যবৃদ্ধি’র মনোভাব নিয়ে একসময় তারা মসনদের দিকে হাত বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন