ভেজালমুক্ত খাবারের নিশ্চয়তা আজও আমাদের সমাজে বড় এক চ্যালেঞ্জ। ঠিক সেই বাস্তবতা থেকেই আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন বুনেছেন ঢাকার দোহারের গৃহবধূ সাবিহা তানজিম। নিজের উদ্যোগে তিনি গড়ে তুলেছেন Green Shadow। গুড়, শুকনা খাবার, দেশি মসলা, মিষ্টি, বগুড়ার খাঁটি দই, সন্দেশসহ নিরাপদ ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য নিয়ে তার এই পথচলা। এটি শুধুই ব্যবসা নয়; বরং এক সংগ্রাম, বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের গল্প।
ছোটবেলা থেকেই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তবে বিয়ের পর সংসার ও পারিবারিক ব্যস্ততায় সেই স্বপ্ন কিছুটা আড়ালে চলে যায়। ২০১৮ সাল থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় তখনই শুরু করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারির গৃহবন্দি সময়ে অনলাইন বিজনেস গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার উদ্যোক্তা জীবনের প্রস্তুতি শুরু হয়। ধৈর্য, পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে আজ এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
খাদ্যে ভেজাল মেশানো সমাজের একটি বড় সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের তাগিদ থেকেই তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই নারী বিশ্বাস করেন, নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করার। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে, নিরাপদ খাবারের চাহিদাও বাড়ছে—এই বাস্তবতা তার সিদ্ধান্তকে আরো দৃঢ় করে।
নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এই সেক্টরে পথচলা সহজ ছিল না। শুরুতে ভাই ছিলেন সবচেয়ে বড় ভরসা—পণ্যের সোর্সিং থেকে শুরু করে ডেলিভারি পর্যন্ত। বাবা ছিলেন অনুপ্রেরণার জায়গায়, আর স্বামীর আন্তরিক সহযোগিতা তাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে প্রতিটি ধাপে, যদিও পরিবার ও সমাজের একাংশ প্রথম দিকে বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। অনলাইন ব্যবসা নিয়ে ছিল নানা সংশয়, নেতিবাচক মন্তব্য ও অসহযোগিতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের সাফল্যই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। সমালোচকরাই পরে তার প্রশংসা করেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও শুরুটা ছিল কঠিন। কোনো ঋণ বা বড় বিনিয়োগ ছাড়াই নিজের সঞ্চয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। সংসার ও ব্যবসা একসঙ্গে সামলানো, পণ্য সংগ্রহ, কনটেন্ট তৈরি, পেজ পরিচালনা—সবকিছুই করতে হয়েছে একা হাতে। মানসিক চাপ ছিল, ক্লান্তি ছিল, তবু ধৈর্য আর দৃঢ় মনোবল তাকে থামতে দেয়নি।
বর্তমানে Green Shadow ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত আইডির মাধ্যমে সারা দেশে কুরিয়ারে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। করোনাকালে একটি আউটলেট চালু করা হলেও একার পক্ষে তা পরিচালনা কঠিন হওয়ায় আপাতত বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আবার আউটলেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন অনলাইন উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম থেকে তিনি একাধিকবার স্বীকৃতি পেয়েছেন। সরকারি পুরস্কার না পেলেও সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেছেন জয়ীতা পুরস্কার। তার প্রতিষ্ঠান শুধু ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক কার্যক্রমের অর্থায়নেও রাখছে ভূমিকা। বর্তমানে এখানে পাঁচজন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।
নারী উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তার পরামর্শ স্পষ্ট—নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। শুরুতে বাধা আসবেই, নিরুৎসাহিত করার মানুষও থাকবে। তবে যে সেক্টরে কাজ করবেন, সেটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, বাজার ও গ্রাহকের চাহিদা বোঝা এবং মান ও সততার প্রশ্নে আপসহীন থাকাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
তার বিশ্বাস—‘আত্মনির্ভরশীলতাই নারীর সত্যিকারের ক্ষমতায়ন। আর জীবনের মূলমন্ত্র সততা, ধৈর্য ও পরিশ্রম—এই তিনটি গুণ যার আছে, তিনিই টিকে থাকবেন।’
এই গল্প শুধু একজন নারীর নয়; এটি আত্মবিশ্বাসী প্রতিটি নারীর জন্য অনুপ্রেরণার প্রতিচ্ছবি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


নানক–তাপসসহ ২৪ জনকে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ