১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সবাই অংশগ্রহণ করেছিলেন নিজ ভূখণ্ডের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে, সব অন্যায়-অনিয়ম আর শোষণের বিরুদ্ধে। তেমনই এক সাহসী যোদ্ধা আশালতা বৈদ্য। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র নারী কমান্ডার।
১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন আশালতা। যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। কিন্তু দেশের এমন পরিস্থিতিতে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বিবেকের তাড়নায় দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার আগেও ১৯৬৮ সালে, যখন তিনি স্কুলছাত্রী ছিলেন তখন ছাত্র গণআন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। মা-বাবার প্রথম সন্তান ছিলেন আশালতা। বাবা হরিপদ বৈদ্য আর মা সরলাময়ী বৈদ্যও ছিলেন পাকিস্তানি শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। রাজাকাররা তার বাবার কাছে ছয় লাখ টাকা দাবি করে, তা না হলে তাকে ও তার বোনকে তুলে নিয়ে যাবে বলে হুমকি দেয়। তখন তার মা-বাবা ভয় পেয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ওই সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হেমায়েত উদ্দিন তার বাবার কাছে এসে বলেন, ‘একজন যোদ্ধা লাগবে আপনার পরিবারের কাছ থেকে।’ তার বাবা বলেন, ‘আমার তো কোনো ছেলে নেই, কে যুদ্ধ করবে?’ আশালতা তখন সাহস করে বলেন, ‘আমি যুদ্ধে যাব।’ মেয়ের সাহস আর দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখে তার বাবা আর তাকে বাধা দেন না; বরং বলেন, ‘আমার মেয়েকে আমি দেশের জন্য উৎসর্গ করলাম।’
আশালতা নিজে তো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেনই, আরো ৪৫ নারী যোদ্ধা জোগাড় করে দল ভারী করলেন। তারপর শুরু হলো প্রশিক্ষণ। জহরের কান্দি হাইস্কুল আর লেবুবাড়ী প্রাইমারি স্কুল—এই দুটি ক্যাম্পে ছেলে আর মেয়ে যোদ্ধাদের আলাদা করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গেরিলা আক্রমণ, পাকিস্তানি আর্মিদের প্রতিহত করার কৌশলসহ বিভিন্ন রণকৌশলে আশালতার বুদ্ধিমত্তা মুগ্ধ করল প্রশিক্ষক বাবুল আকতার ও হেমায়েত উদ্দিনকে। তাই ক্যাম্পে তার চেয়ে বেশি বয়সি নারী যোদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাকেই দেওয়া হলো নেতৃত্ব প্রদানের গুরুভার। এভাবেই ইতিহাস গড়লেন তিনি। তিনি হয়ে উঠলেন মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র নারী কমান্ডার।
প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মোট ৩০০ মেয়েকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু ভালোভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয় ৪৫ জন। তাই তাদের ফাস্ট এইড গ্রুপ, সরাসরি অস্ত্র হাতে যোদ্ধা, গোপন তথ্য সরবরাহকারী, খাদ্য সংগ্রহকারী—এমন আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আলাদা হলেও সব দলের দলনেতা ছিলেন আশালতা। এমনকি বিচার বিভাগ নামে গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর ছিল, যেখানে বিচারকরা পাকিস্তানি সৈন্য, রাজাকার ও আলবদরদের বিচার করতেন। সেখানে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ঘাগরবাজার, কলাবাড়ী, পয়সারহাট, রামশীল, বাঁশবাড়িয়া, কোটালীপাড়া, হরিণাহাটি, ঘাগরবাজার, শিকের বাজার ও রামশীলের মতো বেশ কিছু যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং নিজের পারদর্শিতার প্রমাণ দেন। আশালতা কেবল কমান্ডারই ছিলেন না, ছিলেন পরামর্শক, নিয়ন্ত্রক, সংগঠক, সশস্ত্র যোদ্ধা এবং বোমা তৈরি, অস্ত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বার্তাবহন, চিকিৎসা ও সেবার কাজে নিবেদিত, বস্ত্র, ওষুধ ও তহবিল সংগ্রাহক এবং খাদ্য ও আশ্রয়দাত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর পাঠ সম্পন্ন করেন আশালতা। নারীদের জীবন উন্নয়নে সমাজসেবামূলক কাজ করেন। সমাজসেবামূলক কাজের জন্য ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বাছাই কমিটিতে মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায়ের রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক, রোকেয়া পদক ও প্রশিকা মুক্তিযোদ্ধা পদকও পেয়েছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

