মাটির ওপর দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে ছুটে চলা কিংবা কোনো অসুবিধা ছাড়াই গাছে চড়া ও পানিতে ভেসে চলা সাপ দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—পা ছাড়াই কীভাবে এত দক্ষতার সঙ্গে চলাচল করে প্রাণীটি? আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও সাপের শরীরের বিশেষ কিছু বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি সম্ভব হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোটি কোটি বছর আগে সাপেরও পা ছিল। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার ও সায়েন্টিফিক আমেরিকানে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, সাপের প্রাচীন জীবাশ্ম বা ফসিল বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণটি এসেছে আর্জেন্টিনায় পাওয়া ‘নাজাশ রিয়োনেগ্রিনা’ নামের এক প্রাচীন সাপের জীবাশ্ম থেকে।
সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাস করা এই সাপের ছোট হলেও দুটি স্পষ্ট পেছনের পা ছিল।
এ ছাড়া প্রায় ১২ কোটি বছর আগের ‘টেট্রাপোডোফিস’ নামের চার পায়ের একটি সরীসৃপের জীবাশ্ম নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যা সাপ ও টিকটিকির মধ্যবর্তী বিবর্তনকে নির্দেশ করে।
শুধু জীবাশ্ম নয়, বংশগতিবিদ্যার বা জেনেটিকস গবেষণাতেও সাপের পা থাকার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে সাপের ভ্রূণের ওপর এক গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক সাপের দেহে পা গজানোর জন্য প্রয়োজনীয় জেনেটিক কোষ এখনও সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘সনিক হেজহগ’ নামের একটি জিন টিকটিকির পায়ের আকার নির্ধারণ করে। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির জিনতত্ত্ববিদদের মতে, বিবর্তনের ধারায় অজগর, ভাইপার ও কোবরার মতো সাপের ডিএনএ থেকে এই জিনের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তবে আজও অজগরের লেজের কাছে ‘স্পার্স’ নামে ছোট যে কাঁটার মতো কাঠামো দেখা যায়, তা মূলত তাদের পূর্বপুরুষদের পেছনের পায়েরই বিবর্তিত অবশিষ্টাংশ।
কেন পা হারাল সাপ?
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীন সাপগুলো এমন পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছিল যেখানে পা থাকাটা সুবিধার চেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর নিবন্ধ অনুযায়ী, প্রাচীন সাপগুলো মূলত মাটির নিচে গর্তে এবং পাথর বা উদ্ভিদের সংকীর্ণ জায়গায় বাস করত। সরু সুড়ঙ্গে চলাচলের জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহীন দীর্ঘ শরীরই ছিল বেশি কার্যকর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সাপের বাইরের পাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।
পা ছাড়া কীভাবে চলে সাপ?
পায়ের ঘাটতি মেটাতে চলাচলের এক বিস্ময়কর উপায় তৈরি করেছে সাপ। মানুষের মেরুদণ্ডে যেখানে ৩৩টি কশেরুকা বা হাড়ের জোড়া থাকে, সেখানে সাপের শরীরে থাকে ২০০ থেকে ৪০০টি কশেরুকা। এগুলো শক্তিশালী পেশির মাধ্যমে যুক্ত থাকায় সাপ শরীরকে সহজেই বাঁকাতে ও মোচড়াতে পারে। এ ছাড়া পেটের নিচের চওড়া আঁশ মাটির সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি করে এদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
পরিবেশভেদে সাপের চলার পদ্ধতিও ভিন্ন হয়। যেমন—
এস (S) আকৃতির ঢেউ খেলানো চলন
গোখরা, দাঁড়াশ ও ভাইপার জাতীয় সাপ শরীর বাঁকিয়ে এই পদ্ধতিতে সচরাচর চলাচল করে।
সোজা পথের চলন
অজগরের মতো বড় সাপ ভারী শরীর না বাঁকিয়ে পেটের পেশি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে সোজা পথে এগিয়ে যায়।
সংকুচিত ও প্রসারিত চলন
গর্ত বা গাছে ওঠার সময় সাপের দেহের এক অংশ স্থির রেখে অন্য অংশ টেনে সামনে নেওয়া হয়।
পাশ কাটিয়ে চলা
মরুভূমির নরম ও উত্তপ্ত বালুতে পিছলে না গিয়ে দ্রুত চলার জন্য কতিপয় সাপ এই কৌশল ব্যবহার করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পা না থাকাটা সাপের দুর্বলতা নয়, বরং অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব প্রান্তে এদের সফলভাবে টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার। কারণ বিবর্তন সেরা শারীরিক গঠন দিয়ে নয়, বরং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতার মাধ্যমেই জীবনকে বিকশিত করে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


