আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন নবীজির খলিফা ও জনমানুষের একজন আদর্শ শাসক। মানুষের কল্যাণে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। খিলাফতের মতো মহান ও গুরুভার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও তিনি মানবসেবার অঙ্গীকার কখনো ভুলে যাননি। সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বদা অন্যের উপকারে এগিয়ে এসেছেন। মানুষকে সৎপথে চলার উপদেশ দিয়েছেন এবং অন্যায় ও অসত্য থেকে দূরে রাখার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করেছেন। তার ব্যক্তিত্ব, অবস্থান ও আচরণ দ্বারা অন্যদের হৃদয়ে হিদায়াত, ঈমান ও নৈতিকতার আলোকবর্তিকা প্রজ্বালিত করেছেন। এ রকম বহু ঘটনার মধ্য থেকে কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো—
বকরির দুধ দোহন
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের আগে আবু বকর (রা.) মহল্লার লোকদের বকরি দোহন করে দিতেন। তিনি যখন খলিফা হলেন, তখন এক দাসী বললেন, ‘(তিনি এখন মুসলিম জাহানের খলিফা।) এখন আর আমাদের বকরি দোহন করে দেবেন না।’ দাসীর মন্তব্য আবু বকর (রা.)-এর কানে গেল। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি তোমাদের বকরি দোহন করে দেব। আশা করি, যে দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে, তা আমার চরিত্র ও স্বভাব বদলে দেবে না।’
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও তিনি মহল্লার লোকদের বকরি দোহন করতেন। (তাবাকাতে ইবনে সাদ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৮৬)। এই ঘটনায় আবু বকর (রা.)-এর অনন্য বিনয় ও মানবিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ, অন্যদের চেয়ে মর্যাদাবান ও সম্মানিত। তিনি ছিলেন মুসলিম জাহানের খলিফা। তারপরও মানুষের সঙ্গে আগের মতোই আচরণ করেছেন। খিলাফতের দায়িত্ব পালনের সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হলেও তিনি সেবাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
অন্ধ বৃদ্ধার সেবা
উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) রাতের বেলা মদিনার উপকণ্ঠের এক অন্ধ বৃদ্ধা নারীর দেখাশোনা করতেন। তিনি তার খোঁজখবর নিতেন, পানি এনে দিতেন এবং অন্যান্য কাজ করতেন। কিন্তু তিনি যখনই বৃদ্ধার কাছে যেতেন, দেখতেন, তার আগে কেউ একজন এসে ঘরের সব কাজ করে দিয়েছেন। উমর (রা.) আগে এসে বৃদ্ধার সেবা করার চেষ্টা করতে লাগলেন।
অবশেষে তিনি গোপনে বৃদ্ধার ঘরের দিকে লক্ষ রাখলেন। তিনি দেখতে পেলেন, সেই ব্যক্তি আর কেউ নন—তিনি ছিলেন আবু বকর (রা.)। অথচ সেই সময় তিনি ছিলেন মুসলিম জাহানের খলিফা। (আবু বকর সিদ্দিক, তানতাবি, পৃষ্ঠা: ২৯)
কারো সঙ্গে কথা না বলার মানত করা নারীকে উপদেশ
আবু বকর (রা.) জাহেলি যুগের রীতিনীতি ও দ্বীনে নব-আবিষ্কৃত (বিদআত) বিষয়াদি থেকে থেকে মানুষকে বিরত রাখতেন। ইসলাম ও নবীজির সুন্নাতের অনুসরণে আহ্বান জানাতেন।
খলিফা আবু বকর (রা.) জয়নব নামের আহমাস গোত্রের এক নারীর কাছে গেলেন। দেখলেন, সে কারো সঙ্গে কথা বলছে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে কথা বলছে না কেন?’ লোকেরা বলল, ‘সে নীরবতা পালনের মানত করেছে।’ তখন তিনি মহিলাটিকে বললেন, ‘তুমি কথা বলো। ইসলাম এর বৈধতা দেয় না। এটা জাহেলি যুগের রীতি-রেওয়াজ।’
খলিফার কথা শুনে মহিলাটি কথা বলল। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৩৮৩৪)
সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধে
আবু বকর (রা.) সবসময় সৎকাজের আদেশ দিতেন এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করতেন। মানুষের বুঝতে ভুল হলে তিনি স্পষ্ট করে বলতেন। তিনি বলেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘লোকেরা যখন কোনো অন্যায় দেখেও তা পরিবর্তন করার চেষ্টা করে না, তখন আল্লাহ সবাইকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৩৩৮)
তিনি সব সময় মানুষকে সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এক ব্যক্তি তাকে সালাম দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুলের খলিফা! তিনি বললেন, ‘এত যোগ্য মানুষ থাকতে আমাকেই আপনি এই সম্মানে সম্বোধন করছেন!’ (আখলাকুর রাবি ও আদাবুস সামি, খতিব বাগদাদি, হাদিস নং: ২৫৫।)
তিনি পুত্র আবদুর রহমানকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদাচারের উপদেশ দিতেন। একদিন আবদুর রহমানকে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখলেন। তিনি বললেন, ‘প্রতিবেশীর সঙ্গে তর্কে জড়িও না। কারণ অন্য মানুষেরা চলে গেলেও প্রতিবেশী থেকে যাবে।’ (কিতাবুজ জুহদ, ইবনে মুবারক, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৫১)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

