বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং অনলাইন উদ্যোক্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ তরুণ নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাত শুধু কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তই খুলে দেয়নি, বরং বৈদেশিক আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের কাছে তরুণদের প্রধান প্রত্যাশা একটি দক্ষতানির্ভর, প্রযুক্তিবান্ধব এবং ভবিষ্যৎমুখী নীতিমালা।
প্রথমত, দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠছে তরুণদের পক্ষ থেকে। বর্তমানে অনেক তরুণ প্রযুক্তি খাতে কাজ করতে আগ্রহী হলেও মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে আধুনিক আইটি ট্রেনিং সেন্টার, আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ চালু করা হলে তরুণরা বৈশ্বিক মার্কেটে আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। বিশেষ করে, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ডেটা অ্যানালাইসিস ও সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট জব খাতে নীতিগত সহায়তা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, সহজ ব্যাংকিং সাপোর্ট এবং আর্থিক লেনদেনের জটিলতা এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। নতুন সরকার যদি বৈদেশিক আয় গ্রহণের প্রক্রিয়া আরো সহজ করে, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সরকারি স্বীকৃতি ও প্রণোদনা চালু করে এবং ডিজিটাল আয়ের বৈধ কাঠামো শক্তিশালী করে, তাহলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে পারবে।
তৃতীয়ত, দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়ন তরুণদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা। গ্রাম ও শহরের মধ্যে এখনো ইন্টারনেটের গতি ও মানে বৈষম্য রয়েছে, যা প্রযুক্তিনির্ভর কাজের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ তরুণরাও সমানভাবে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারবে।
চতুর্থত, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা তরুণরা প্রায়ই ফান্ডিং, মেন্টরশিপ এবং ইনকিউবেশন সুবিধার অভাবে থেমে যায়। সরকার যদি স্টার্টআপ ফান্ড, ট্যাক্স রিবেট, প্রযুক্তি পার্ক সম্প্রসারণ এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পে অনুদান বৃদ্ধি করে, তাহলে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির বাস্তবমুখী অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের দাবি। শুধু তাত্ত্বিক আইটি শিক্ষা নয়, বরং স্কুল-কলেজপর্যায় থেকেই কোডিং, ডিজিটাল স্কিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনলাইন আয়ের মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে।
এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা, অনলাইন উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা নতুন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে, তাই শক্তিশালী সাইবার আইন ও সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ আর এই তরুণ শক্তিই দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। নতুন সরকার যদি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে একটি স্মার্ট, দক্ষ এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তরুণদের প্রত্যাশা শুধু সুযোগের নয়, বরং এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ যেখানে দক্ষতা হবে সফলতার মূল চাবিকাঠি এবং তথ্যপ্রযুক্তিই হবে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

