ব্যয়বহুল ফোল্ডেবল আইফোন এনে বড় জুয়া খেলছে অ্যাপল

ব্যয়বহুল ফোল্ডেবল আইফোন এনে বড় জুয়া খেলছে অ্যাপল
ছবি: সংগৃহীত

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহেই বড় পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন ন টার্নাস। গত ২০ বছরের মধ্যে আইফোনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে কোম্পানিটি।

বিজ্ঞাপন

বুধবার বার্ষিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ফোল্ডেবল আইফোন উন্মোচন করেন টার্নাস। টিম কুকের পদত্যাগের পর অ্যাপলের শীর্ষ পদে বসেছেন তিনি।

বইয়ের মতো ভাঁজ করা নতুন আইফোনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডুও’। এটিই এখন পর্যন্ত আইফোনের সবচেয়ে বড় সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রাথমিক দাম ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২০০ ডলার পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। ফলে এটি শুধু আইফোন নয়, বর্তমানে বাজারে থাকা সবচেয়ে দামি ফোনগুলোর একটি।

টার্নাস বলেন, ডুও ‘আইপ্যাড দ্বারা অনুপ্রাণিত’। তবে এর ভাঁজ করার ব্যবস্থা ‘সাবলীল ও সম্পূর্ণ স্বজ্ঞাত’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অ্যাপলের ভেতরে ফোল্ডেবল ফোন তৈরির কাজ চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। খোলা অবস্থায় ডুওকে ছোট একটি আইপ্যাডের মতো দেখায়। অর্ধেক ভাঁজ করলে এটি চওড়া একটি আইফোনের আকৃতি নেয়।

অনুষ্ঠানে টার্নাস বলেন, বাজারে থাকা অন্য ফোল্ডেবল স্মার্টফোনগুলোর নকশা ও ব্যবহারিক অনুভূতি থেকে অ্যাপল আলাদা থাকতে চেয়েছে।

তার মতে, সেসব ফোনকে অনেক সময় ‘দুটি ফোন একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মতো’ মনে হয়। এতে বড় পর্দাটিকেও অনেক ছোট মনে হয়।

টার্নাস বলেন, ডুও ‘ধারাবাহিক কিছু অসাধারণ উদ্ভাবনের ফল’।

তার দাবি, এটি ফোল্ডেবল ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।

ফোল্ডেবল আইফোন তৈরির কাজের সঙ্গে টার্নাস সরাসরি যুক্ত ছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে কুকের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত হওয়ার আগে তিনি বহু বছর অ্যাপলের হার্ডওয়্যার বিভাগের শীর্ষ নির্বাহী ছিলেন।

প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এফডিএম সিসিএস ইনসাইটের প্রধান বিশ্লেষক বেন উড বলেন, টার্নাসের পদোন্নতির সময়টি সম্ভবত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে তা গত কয়েক বছরের অন্যতম বড় আইফোন উন্মোচনের সঙ্গে মিলে যায়।

তার ভাষায়, ‘অ্যাপলে কোনো কিছুই আকস্মিকভাবে ঘটে না।’

ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিসের বিশ্লেষক ক্যারোলিনা মিলানেসি বুধবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তার কাছে টার্নাসকে যেভাবে সামনে আনা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে যেন তিনি নিজেই একটি পণ্য।

২০০৭ সালে প্রথম আইফোন বাজারে আসার পর অ্যাপল বড় কোনো সাফল্য বা সত্যিকারের আকর্ষণীয় উদ্ভাবন আনতে পারেনি—এমন সমালোচনা দীর্ঘদিনের। আইফোনের নকশায় বড় পরিবর্তন এনে সেই সমালোচনার কিছুটা জবাব দিতে চাইছে অ্যাপল।

তবে ফোল্ডেবল আইফোনের উচ্চ দাম কোম্পানিটির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। ফরেস্টারের বিশ্লেষক দীপঞ্জন চ্যাটার্জি বলেন, ফোল্ডেবল ফোনটি অ্যাপলের পণ্য তালিকায় উচ্চমূল্যের একটি ‘অলঙ্কার’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে শুধু ব্র্যান্ডের মর্যাদা বাড়তে পারে, কিন্তু অর্থবহ প্রবৃদ্ধি নাও আসতে পারে।

এর আগে নতুন আইফোনের সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক দাম ছিল ৯০০ ডলার (৬৬৪ পাউন্ড)। বুধবার অ্যাপল আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্সও উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই দুই মডেলের দাম শুরু হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ১৯৯ ডলার (৮৫৫ পাউন্ড) এবং ১ হাজার ২৯৯ ডলার (৯৫৯ পাউন্ড) থেকে।

চ্যাটার্জির মতে, ফোল্ডেবল আইফোনের পরিণতি অ্যাপলের ভিশন প্রো হেডসেটের মতোও হতে পারে। ভিশন প্রোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৬৯৯ ডলার (২ হাজার ৭২৯ পাউন্ড)। কিন্তু এটি ক্রেতাদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।

আবার ফোল্ডেবল আইফোন অ্যাপল ওয়াচের মতোও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। অ্যাপল ওয়াচ আইফোনের মতো জনপ্রিয় না হলেও প্রতি বছর এটি কেনেন লাখ লাখ মানুষ।

আইফোন ব্যবহারে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত। নতুন নকশার ফোন ব্যাপকভাবে বিক্রি হওয়ার পথে এটিও একটি বাধা হতে পারে।

মিলানেসি বলেন, ফোল্ডেবল ফোন আকর্ষণীয় ডিভাইস। অনেকেই এতে আগ্রহী। কিন্তু প্রচলিত ফোন থেকে ফোল্ডেবল ফোনে যাওয়ার ক্ষেত্রে সফটওয়্যার এবং নতুন ব্যবহারের ধরন শেখার বিষয়টি বেশ কঠিন।

বেন উড বলেন, স্যামসাং ও হুয়াওয়ের মতো কোম্পানির ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বর্তমান বাজার স্মার্টফোন বিক্রির মাত্র ২ শতাংশ।

ডেটা ও অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান এফডিএম সিসিএম ইনসাইটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অ্যাপলের ফোল্ডেবল ফোন বাজারে আগ্রহ ও চাহিদা বাড়ালেও আগামী দশকে এর বিক্রি মোট স্মার্টফোন বাজারের মাত্র ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

আইফোন অ্যাপলের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্য। প্রতিবছর কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকের বেশি আসে এই ফোন থেকে। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রান্তিকে অ্যাপল বলেছে, আইফোনের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফোনটির সর্বশেষ সংস্করণও সবচেয়ে সফল পণ্য হিসেবে বাজারে এসেছে বলে দাবি করেছে কোম্পানিটি।

এদিকে আইফোনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সুবিধা নিয়েও নতুন তথ্য দিয়েছে অ্যাপল। কোম্পানির অডিও ও চ্যাট সহকারী সিরির আসন্ন পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এখন এর নাম দেওয়া হচ্ছে ‘সিরি এআই’।

আইফোন ১৮ থেকে সিরি ফোনের মেসেজ ও ই-মেইলের মতো ব্যক্তিগত তথ্য ঘেঁটে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করতে পারবে। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজও করতে পারবে এটি।

নতুন অ্যাপল ওয়াচেও সিরি এআইয়ের কিছু সুবিধা থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে কথোপকথনের নোট নেওয়া এবং তা লিখিত রূপ দেওয়ার সুবিধা। তবে ব্যবহারকারীকে এই সুবিধা চালু করতে হবে।

টার্নাস আইফোনের নতুন এআই সুবিধাগুলোকে ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তিগত কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, এসব সুবিধা চালাতে অ্যাপল ব্যবহারকারীর ‘দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিবরণ’ ব্যবহার করবে।

তবে এসব তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন টার্নাস। তিনি বলেন, এআইয়ের বেশির ভাগ কাজই ‘ডিভাইসে’ সম্পন্ন হবে। অর্থাৎ তৃতীয় কোনো কোম্পানির মাধ্যমে এসব তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করা হবে না।

কোনো কাজের জন্য তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হলে সেটিও দূরবর্তী সার্ভার বা ক্লাউডে গোপন রাখা হবে বলে জানান তিনি।

টার্নাস বলেন, অন্যরা ব্যক্তিগত তথ্যকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে দেখে। কিন্তু অ্যাপলের ক্ষেত্রে এমনকি কোম্পানিটিও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন