বিশ্বজুড়ে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর তথ্যমতে, সারা দেশে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৭৮টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের সেবা ও পণ্য বেচাকেনা, লেনদেনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালনা করছে।
দেশে বর্তমানে এক কোটির বেশি মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডিজিটাল মার্কেট প্লেসে বাংলাদেশি ক্রেতার সংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
ডিজিটাল মার্কেট প্লেসে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণাও। মানহীন নকল পণ্যের পাশাপাশি পণ্যের মিথ্যা তথ্য ও লোভনীয় অফারের ফাঁদ পেতে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করছেন সেলাররা।
ফেসবুক পেজকে ব্যবহার করে নিজেদের ওয়েবসাইটে লোভনীয় Sale অফারের নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত বেশিরভাগ নামিদামি ব্যান্ডও। আইনের সঠিক প্রয়োগ, সরকারের নজরদারির ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির কারণে বাড়ছে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সংখ্যা।
ডিজিটাল মার্কেট প্লেসের ক্রেতাদের স্বার্থ দেখার দায়িত্বে থাকা সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে বেশ ভালো ভূমিকা রাখছে। তবে তাদের অনলাইন ভার্সনে প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা বেশ লক্ষণীয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, অভিযোগ দাখিলের পর ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ সম্পন্ন করা হয়। গড়ে প্রতি মাসে ২২ কার্যদিবস ধরা হলে একটি অভিযোগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। একটি অভিযোগ সম্পন্ন হওয়ার জন্য তিন মাস বেশ লম্বা সময়। সময়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতারণার শিকার বেশিরভাগ গ্রাহকই অভিযোগ করার আগ্রহ পান না।
যেসব ভুক্তভোগী ৬০ কার্যদিবসের বাস্তবতা মেনে নিয়ে অভিযোগ দাখিল করেন, তাদের অনেকেরই অভিযোগ—ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে অনটাইম রেসপন্স পাওয়া যায় না। অনলাইনে অভিযোগ দাখিল করার তিন মাস পার হয়ে গেলেও ভোক্তা অধিকার থেকে কোনো রেসপন্স না পাওয়ার বেশ কয়েকটি অভিযোগ পর্যালোচনা করে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া ১৫টি অভিযোগের একটি জুন মাসের মাঝামাঝি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে অভিযোগ দাখিল করেন প্রতারণার শিকার এক গ্রাহক (গ্রাহকের ব্যক্তিগত প্রাইভেসির কারণে অভিযোগের নির্দিষ্ট তারিখ ও ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করা হলো না)। কিন্তু তিন মাসেও অভিযোগটি নিয়ে কোনো রেসপন্স পাননি ওই অভিযোগকারী।
আরেকটি অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অনলাইনে অভিযোগ সাবমিট করার এক মাস পরও শুনানির তারিখ পাননি ভুক্তভোগী। শেষে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কল সেন্টারে পাঁচবার কল দিয়ে অভিযোগের শুনানির তারিখ পান আরো এক মাস পর। নিষ্পত্তি হওয়া আরেকটি অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেলারের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও সেলারকে সর্বনিম্ন জরিমানা করা হয়েছে।
পর্যালোচনা করা বেশিরভাগ অভিযোগেই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারার ব্যর্থতা লক্ষণীয়। ডিজিটাল মার্কেট প্লেসে ক্রেতা-বিক্রেতার বিপরীতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের লোকবল সংকট প্রকট। যে হারে ক্রেতা-বিক্রেতা বাড়ছে, সে হারে বাড়েনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের লোকবল।
২০৩০ সালের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটা করা গ্রাহকের সংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা, সেটি মাথায় রেখে সরকারের উচিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের লোকবল বাড়িয়ে সংস্থাটির কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এতে যেমন গ্রাহকের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, তেমনি বাড়বে সরকারের রাজস্বও।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

