আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলায় মুসলিমদের আগমন ও বসতি স্থাপনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

ড. মোহর আলি

বাংলায় মুসলিমদের আগমন ও বসতি স্থাপনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

খ. চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার স্থানীয় উপভাষায়, বিশেষত চট্টগ্রামের কথ্য ভাষায় বিপুল পরিমাণ আরবি শব্দ, বাক্যাংশ ও বাগ্‌ধারার সংমিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি বহু প্রকাশভঙ্গি আরবির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়। কেউ যদি চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষা বুঝতে সক্ষম হন, তবে সহজেই লক্ষ করবেন, এটি আরবি-বাংলার এক অদ্ভুত মিশ্রণ; শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আধুনিক চট্টগ্রামীয় ভাষার প্রায় ৫০ শতাংশ শব্দভাণ্ডার খাঁটি আরবি বা আরবি-উৎপত্তিজাত শব্দে গঠিত। এ অঞ্চলের বহু স্থানের নাম আরবি উৎস থেকে এসেছে, বহু আরবি প্রথা ও খেলাধুলা এখানে প্রচলিত, এমনকি বাহ্যিক চেহারা ও আচার-আচরণেও চট্টগ্রামের অনেক মুসলমানের সঙ্গে আরবদের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ফলে ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে, এত গভীর ও বিস্তৃত আরবীকরণ কেবল অল্প কিছু পরিব্রাজক আরব বণিকের সঙ্গে মাঝেমধ্যে যোগাযোগের ফল হতে পারে না; বরং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আরবের দীর্ঘকালীন ও স্থায়ী বসতির প্রমাণ বহন করে। (পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম, ইনামল হক, পৃষ্ঠা: ১৯)

বিজ্ঞাপন

এটা বলা উচিত হবে না যে, যখন বাংলায় মুসলমানরা প্রভাবশালী হয়েছিল এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আরব দুনিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করত, সে সময়কার যোগাযোগের ফলেও ভাষাকেন্দ্রিক এই প্রভাব বিস্তার হয়ে থাকতে পারে। কারণ চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলার উপকূলে মুসলিম আধিপত্য কার্যকর হওয়ার সময় আরবদের নৌ-অভিযান ও সমুদ্রপথে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়েছিল। সুতরাং তখনকার আরবরা এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ওপর এত বেশি প্রভাব বিস্তার করবে, তা সম্ভব নয়। তদুপরি মুসলিম বিজয়ের পর বাংলায় আগত মুসলমানরা প্রধানত তুর্কি, ইরানি ও আফগান বংশোদ্ভূত ছিল। বাস্তবে মুসলিম বিজয়ের পর আরব প্রভাবের বদলে ফারসি ভাষা, পারসিক আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি প্রাধান্য লাভ করে। যদি মুসলিম বিজয়ের পরের অভিবাসনের কারণেই ভাষার আরবীকরণ হতো, তবে তা প্রথমে বিজিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম বাংলায় বেশি দৃশ্যমান হতো। অথচ ওই অঞ্চলে আরব প্রভাব অত্যন্ত নগণ্য। এর বিপরীতে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে আরব প্রভাব সবচেয়ে প্রবল। অথচ এসব অঞ্চল মুসলিমদের রাজনীতির প্রভাবাধীন দেরিতে হয়েছিল। এর একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলো, উত্তর ভারতের দিক থেকে মুসলিম সেনাপতিদের বিজয়াভিযান পরিচালনার বহু আগে এ অঞ্চলে আরব মুসলিমরা প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল।

গ. চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে সোনারগাঁয়ের ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের শাসনকালে মুসলিম সেনারা প্রথম চট্টগ্রামে পৌঁছে। কিন্তু সমগ্র অঞ্চল ষোড়শ শতাব্দীর আগে কার্যকরভাবে মুসলিম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ৯২৪ হিজরি/১৫১৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ বণিক বারবোসা যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন তিনি যে সমৃদ্ধ শহরটিকে ‘বেঙ্গালা’ বলে উল্লেখ করেছেন, সেখানকার প্রধান জনগোষ্ঠী ছিল আরব, পারসিক ও আবিসিনিয়ার ধনী মুসলিম বণিকরা। তারা বিশাল সব জাহাজের মালিক ছিল এবং উৎকৃষ্ট মানের সুতির কাপড়, চিনি ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য করোমণ্ডল (পূর্ব ভারতের উপকূল, গঙ্গা উপত্যকা ও সমুদ্রসীমা), মালাবার (দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক ও কেরালা উপকূল), কেমবে (বর্তমান কাবাই, গুজরাট, ভারত), পেগু (বর্তমান বাগো, মিয়ানমার), টেনাসেরিন (পেঁয়াং, মিয়ানমার উপকূল), সুমাত্রা (ইন্দোনেশিয়া), মালাক্কা (মালয়েশিয়া) ও সিলনে রপ্তানি করত। (The Principal Navigations, Voyages, Traffiques and Discoveries of the English Nation, Hakluyt, ভলিউম: ২, পৃষ্ঠা: ১৪৪-১৪৫)। রাতারাতি এত সমৃদ্ধ মুসলিম বণিক সম্প্রদায় গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। যুক্তিসংগতভাবে বলা যায়, আরবসহ অন্যান্য দেশের মুসলিম বণিকরা মুসলিম বিজয়ের অনেক আগেই বাংলার উপকূলীয় বন্দরনগরীতে বসতি স্থাপন করেছিল।

ঘ. স্থানীয়ভাবে বহুল প্রচলিত আছে যে, মুসলিম-বিজয়ের আগেই বহু শায়খ, আলেম ও জাহেদ (ফকিহ ও সুফি সাধক) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় এসেছিলেন। তারা এখানে বসতি স্থাপন করেন এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের কবরও রয়েছে। এ ধরনের প্রাথমিক পর্যায়ের ইসলাম প্রচারকদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান হলেন—মুন্সীগঞ্জ জেলার রামপালে সমাহিত বাবা আদম শহীদ (জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৮৮৯, পৃষ্ঠা: ১২); ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার মদনপুরে সমাহিত শাহ সুলতান রুমি (বঙ্গে সুফি প্রভাব, ইনামুল হক, পৃষ্ঠা: ১৩৮); বগুড়ার মহাস্থানে সমাহিত শাহ সুলতান মাহিসওয়ার (জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৮৭৫, পৃষ্ঠা: ১৮৩-১৮৬ ও জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৮৭৮, পৃষ্ঠা: ৮৮-৯৫); এবং পাবনা জেলার শাহবাজপুরে সমাহিত মখদুম শাহ দৌলা শহীদ (জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৯০৪, পৃষ্ঠা: ২৬২-২৭১; বেঙ্গল ডিসট্রিক্ট গেজেটারস, পৃষ্ঠা: ১২১-১৩৬)। তাদের বাংলায় আগমনের সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা বর্তমান সময়ে বেশ কঠিন। তারা পঞ্চদশ শতাব্দীর আগে এই অঞ্চলে এসেছিলেন বলে অনুমান করা যায়। শাহ সুলতান রুমি রাহিমাহুল্লাহর বিষয়ে আমরা জানি, তিনি ৪৪৫ হি./১০৫৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় এসেছিলেন। এই তথ্য আওরঙ্গজেবের শাসনকালে (১০৮২ হি./১৬৭১ খ্রি.) রচিত এক ফারসি দলিলে উল্লেখ আছে। (বঙ্গে সুফি প্রভাব, ইনামুল হক, পৃষ্ঠা: ১৩৮)। এখানে লক্ষণীয়, বাংলার সুলতানরা তাদের মাজারকে গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দিতেন এবং সেখানে মসজিদ ও সমাধি নির্মাণ করতেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব শায়খের কারো কারো ক্ষেত্রে বলা হয়, তারা সমুদ্রপথে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। যেমন শাহ সুলতান মাহিসওয়ার (রাহ.) সম্পর্কে বলা হয়, তিনি গঙ্গার মোহনায় সন্দ্বীপ থেকে মাছ আকৃতির বা মাছের প্রতিমা খোদাই করা নৌকায় এসেছিলেন, তাই তিনি মাহিসওয়ার বা ‘মাছসওয়ার’ নামে খ্যাত হন। একইভাবে মখদুম শাহ দৌলা শহীদের ক্ষেত্রে বলা হয়, তিনি একদল অনুসারী নিয়ে ইয়ামান থেকে জাহাজে করে এখানে এসেছিলেন। এসব কাহিনির সত্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ। তা সত্ত্বেও কখনো কখনো গল্পকাহিনি লোককথার মধ্যেও ঘটনার ছায়া পাওয়া যায়। এসব কিচ্ছা-কাহিনি অন্তত এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়—জনগণ সমুদ্রপথে আগত মুসলিম সাধকদের সঙ্গে পরিচিত ছিল।

ঙ. বাংলার মুসলিম বিজয়ের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক উৎস তাবাকাত-ই-নাসিরির রচয়িতা মিনহাজুদ্দিন সিরাজ চমকপ্রদ কিছু তথ্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলো প্রমাণ করে, মুসলিম বণিক ও ধর্মপ্রচারকরা মুসলিম বিজয়ের আগেই বাংলায় এসেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘যখন বাংলার বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে (প্রধান বাহিনী পেছনে ছিল) নদিয়ার ফটকে পৌঁছান, তখন প্রহরীরা তাদের মুসলিম ঘোড়া-বণিক ভাবল এবং নগরে প্রবেশে বাধা দিল না।’ (তাবাকাত-ই-নাসিরি, পৃষ্ঠা: ৫৫৭)। এর থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, স্থানীয়রা মুসলিম বণিকদের সঙ্গে পরিচিত ছিল এবং আগমনে অভ্যস্ত ছিল। মিনহাজ আরো উল্লেখ করেছেন, ‘নতুন বিজেতার (বখতিয়ার খিলজি) প্রথম দিকের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম ছিল শায়খদের জন্য খানকাহ নির্মাণ।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৫৪০)। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়, এর আগেই বহু ইসলাম প্রচারক বাংলায় অবস্থান করেছেন এবং তাদের জন্য খানকাহ নির্মাণের প্রয়োজন ছিল।

বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের অনেক আগে থেকেই মুসলিম বণিক ও ধর্ম প্রচারকরা বাংলায় আগমন করেছিলেন। বিশেষ করে সিন্ধু বিজয়ের অল্প কিছুদিন পরে অথবা তারও আগে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে আরব মুসলিম বণিকরা এসে সামান্দার বন্দর ও অন্যান্য স্থানে বাণিজ্য করত। আর যদি পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে আবিষ্কৃত আব্বাসি যুগের মুদ্রাগুলোকে এ ধরনের বাণিজ্যের প্রমাণ বলে ধরা হয়। তবে এ কথা বলতেই হবে, উপকূলীয় অঞ্চল থেকে তারা বাংলার অভ্যন্তরেও এসেছিলেন। এসব প্রমাণ এ দিকেও ইঙ্গিত করে যে, আরব মুসলমানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। প্রাথমিক যুগের এসব মুসলমানকে দাওয়াতের ইতিবাচক প্রভাব এবং তাদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ও বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থানীয় জনগণের চরিত্র ও বিশ্বাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। বেশ দেরিতে রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হলেও আরব বণিকদের স্থায়ী বসতির কারণে আংশিকভাবে এই অঞ্চলে ইসলামের সাফল্য তুলনামূলকভাবে বেশি এবং মুসলিম জনসংখ্যার আধিক্য লক্ষ করা যায়।

অনুবাদ : গুলজার গালিব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন