আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হ্যান্ডশেকে হতে পারে এই রোগ

ডা. শেখ সাদীউল ইসলাম

হ্যান্ডশেকে হতে পারে এই রোগ

টেনিস এলবো হলো কনুইয়ের বাইরের দিকে ব্যথা হওয়ার একটি রোগ। কনুইয়ের যে জায়গা থেকে হাতের পেশি (টেনডন) শুরু হয়েছে, সেখানে বারবার চাপ পড়লে বা টান লাগলে এই সমস্যা হয়। নাম টেনিস এলবো হলেও, বেশির ভাগ রোগী টেনিস খেলেন না।

কেন হয়?

বিজ্ঞাপন

এই রোগ হয় মূলত হাতের কনুইয়ের একটি পেশি (tendon) দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে। এটি একটি ডিজেনারেটিভ ডিজিস (টেনডন ক্ষয় রোগ), যেখানে মাইক্রো এনজিওফাইব্রোব্লাস্টিক প্রলিফারেশন হয়।

কারা বেশি আক্রান্ত হন?

বয়স সাধারণত ৩৫-৫৫ বছর। পুরুষ এবং নারী সবারই রোগটি হওয়ার সমান সম্ভাবনা থাকে।

* যারা টেনিস/র‍্যাকেট প্লেয়ার যারা ভারী/বেশি মোটা/বেশি চিকন হাতলের র‍্যাকেট ব্যবহার করেন।

* যারা কম্পিউটার মাউস বেশি ব্যবহার করেন।

* বারবার কবজির কাজ করা বা কাস্তে, হাতুড়ি, স্ক্রু-ড্রাইভার ব্যবহার করেন—এমন পেশার মানুষ যেমন : রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইট ভাটার শ্রমিক, দরজি, গৃহিণী, মিউজিশিয়ান (পিয়ানো/ ড্রাম বাদক) অর্থোপেডিক সার্জন।

মজার বিষয় হলো—রাজনীতিবিদ, যারা বারবার হ্যান্ডশেক করেন তাদেরও এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপসর্গ

কিছু ধরতে গেলে বা চেপে ধরলে বা ভারী জিনিস টানতে গেলে কনুইয়ে ব্যথা অনুভব হয়।

বোতল খুলতে কষ্ট, হাত মেলাতে বা কলম ধরতে গেলে ব্যথা হতে পারে। এমনকি ব্যথা কখনো কখনো কবজি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

বেশির ভাগ সময় এক্স-রে বা এমআরআই (MRI) লাগে না।

তবে অস্টিওকনডাইটিস ডেসিক্যান্স, রেডিয়াল টানেল সিন্ড্রোম, প্লাইকা সিন্ড্রোম বা অষ্টিও আর্থ্রাইটিস বোঝার জন্য পরীক্ষা লাগতে পারে।

১. সাধারণ চিকিৎসা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

৯০% রোগী ভালো হয়ে যান—হাতের কবজির পেছনের দিকে বাঁকিয়ে কাজ কমানো ও বিশ্রাম, বরফ সেঁক, ব্যথার ওষুধ (ডাক্তারের পরামর্শে), কনুইয়ের বেল্ট (টেনিস এলবো স্ট্রাপ) ও কবজির স্প্লিন্ট অনুসরণ করলে।

২. ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি

* পেশি টান দেওয়ার ব্যায়াম।

* ধীরে ধীরে শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম নিয়মিত করলে দ্রুত ভালো হয়।

৩. ইনজেকশন

যখন অনেক দিন ধরে না সারে তখন স্টেরয়েড ইনজেকশন খুব ভালো কাজ করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বছরে একাধিকবার দেওয়া লাগতে পারে। পিআরপি ইনজেকশন (পুরোনো রোগে ভালো ফল) দীর্ঘ মেয়াদে ভালো চিকিৎসা পদ্ধতি।

৪. অপারেশন

খুব কম ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। নিয়ম মেনে চিকিৎসা করলে অপারেশন লাগে না। তবে ৬-১২ মাস চিকিৎসা করেও না সারলে বা দৈনন্দিন কাজ অসম্ভব হয়ে গেলে সার্জারি প্রয়োজন হয়। সার্জারি সাধারণত কেটে, আর্থোস্কপিক এবং কখনো কখনো পারকিউটেনিয়াস বা চামড়া ছিদ্র করে অপারেশন করা হয়ে থাকে।

প্রতিকার

কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায়। যেমন—

* কাজ ও খেলাধুলার সময় সতর্কতা।

* একই ধরনের কাজ দীর্ঘক্ষণ না করে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া।

* ভারী জিনিস তোলার সময় কনুই নয়, কাঁধ ও শরীর ব্যবহার করা।

* খেলাধুলায় (টেনিস, ব্যাডমিন্টন ও ক্রিকেট) ভুল স্ট্রোক এড়ানো, র‍্যাকেট বা ব্যাটের গ্রিপ সাইজ ঠিক রাখা, খুব শক্ত করে গ্রিপ না ধরা।

* কাজের আগে ও পরে ফোরআর্ম স্ট্রেচিং করা।

* কবজি ও কনুইয়ের হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা।

* হঠাৎ ভারী ব্যায়াম শুরু না করা।

* কম্পিউটার ব্যবহারে কী-বোর্ড-মাউসের উচ্চতা ঠিক রাখা।

* কবজি সোজা রেখে কাজ করা।

* দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারে বিরতি নেওয়া।

* ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় কাউন্টারফোর্স ব্রেস ব্যবহার করা।

* খেলাধুলার সময় এলবো স্ট্র্যাপ উপকারী।

* ব্যায়ামের পরে বরফ সেঁক নেওয়া।

* কাজের পর হালকা ম্যাসাজ দিলে উপকার পাওয়া যায়।

* ব্যথা শুরু হলে জোর করে কাজ চালিয়ে না গিয়ে শুরুতেই বিশ্রাম নেওয়া এবং ধীরে ধীরে কাজের মাত্রা বাড়ানো।

মনে রাখতে হবে, প্রতিরোধই চিকিৎসার সেরা উপায়। আর ব্যথা শুরু হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন