আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফিট শরীরেও হার্ট অ্যাটাকে চিকিৎসকের মৃত্যু

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ

ফিট শরীরেও হার্ট অ্যাটাকে চিকিৎসকের মৃত্যু
প্রতীকী ছবি

ডাক্তার তো নিজেই সুস্থ ছিলেন—এ ধারণাটিই যেন ভেঙে চুরমার করে দিল ভারতের নাগপুরের সাম্প্রতিক এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। শারীরিকভাবে ফিট, নিয়মিত ব্যায়ামকারী, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সব রিপোর্ট স্বাভাবিক। তবু আকস্মিক হৃদরোগে প্রাণ হারালেন এক বিশিষ্ট নিউরোসার্জন । প্রয়াত চিকিৎসক ড. চন্দ্রশেখর পাখমোডে (৫৩) নাগপুরের একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন। বুধবার ভোরে নিজ বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ হিসেবে তীব্র হার্ট অ্যাটাকের কথাই জানানো হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগেই তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ, সুগার এবং ইসিজি (ECG) রিপোর্ট ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কোনো বড় ধরনের শারীরিক অসুস্থতার ইতিহাসও ছিল না। সহকর্মী ও পরিবার সূত্র জানায়, তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন এবং বাইরে থেকে তাকে দেখে কেউই ভাবতে পারতেন না—এমন একটি ভয়াবহ বিপর্যয় এত দ্রুত নেমে আসতে পারে। এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং চিকিৎসক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাহলে কি ফিটনেস ও স্বাভাবিক রিপোর্টই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা?

বিজ্ঞাপন

কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসিজি পরীক্ষায় মূলত হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম দেখা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ধমনিতে চর্বি জমে তৈরি হওয়া ব্লক, প্লাক বা নীরব ঝুঁকি এতে ধরা পড়ে না। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততা এবং অবিরাম স্ট্রেস—এই সবকিছু মিলেই হঠাৎ মারাত্মক হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা পেশার মতো উচ্চ চাপের কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের শরীরের প্রতি প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে পারেন না। রোগী, দায়িত্ব ও সময়ের চাপের মধ্যে পড়ে নিজেদের ক্লান্তি বা স্ট্রেসকে গুরুত্ব না দেওয়াই হয়ে ওঠে কাল।

তাদের মতে, শুধু একটি স্বাভাবিক রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ স্ক্রিনিং জরুরি। প্রয়োজনে ইকোকার্ডিওগ্রাম, স্ট্রেস টেস্ট বা আরো উন্নত রক্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে—বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন। এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—হৃদরোগ অনেক সময় নীরবে আসে, কোনো পূর্বঘণ্টা বাজায় না। তাই ‘আমি ফিট’ বা ‘রিপোর্ট স্বাভাবিক’—এই আত্মতৃপ্তি নয়, বরং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ ও পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই হতে পারে জীবনের প্রকৃত সুরক্ষা।

মন্তব্য : ফিটনেস ও স্বাভাবিক ECG থাকা সত্ত্বেও হৃদরোগ যে প্রাণঘাতী হতে পারে, ড. পাখমোডের মৃত্যু তারই এক করুণ স্মারক। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের স্ট্রেস ও ক্লান্তিকে অবহেলা করলে তার মূল্য দিতে হয় হঠাৎ করেই—কখনো কখনো জীবন দিয়ে।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি

সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...