আলঝেইমার একটি মস্তিষ্কের রোগ, যা ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। এই রোগের কোনো উপসর্গ এখনো দেখা দেয়নি—এমন মানুষের ওপর এবার পরীক্ষামূলক একটি ওষুধ দেওয়া হবে। লক্ষ্য, ডিমেনশিয়ার উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই আলঝেইমারের বিকাশ থামানো যায় কি না, তা জানা।
ভবিষ্যতে আলঝেইমারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি—এমন সুস্থ মধ্যবয়সি মানুষ এই পরীক্ষায় অংশ নেবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৫৫ থেকে ৮০ বছর বয়সি প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ এতে অংশ নেবেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) সারেতে অ্যান্ড বর্ডারস পার্টনারশিপ এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট এই আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে গবেষণাটি চালাচ্ছে।
সোমবার ইউরোপের প্রথম অংশগ্রহণকারীদের পরীক্ষা করা হবে।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে পরীক্ষা করে দেখা হবে, তাদের কোনো স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা আছে কি না। এরপর তাদের রক্ত পরীক্ষা করা হবে।
রক্তে পি-টাউ২১৭ নামের একটি জৈবচিহ্নের মাত্রা দেখা হবে। এই জৈবচিহ্ন ভবিষ্যতে চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া এবং আলঝেইমার হওয়ার ঝুঁকি বোঝাতে পারে।
আগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তে পি-টাউ২১৭-এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি, তাদের ১০ বছরের মধ্যে চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার আনুমানিক ৭৮ শতাংশ ঝুঁকি রয়েছে।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে পি-টাউ২১৭ পরীক্ষা করে আলঝেইমার শনাক্ত করা সম্ভব। এ পরীক্ষার নির্ভুলতা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
যে ওষুধ পরীক্ষা হবে
তৃতীয় ধাপের এই পরীক্ষার নাম ‘প্রিভেনট্রন’। যাদের রক্তে পি-টাউ২১৭-এর মাত্রা বেশি এবং পরীক্ষার শর্ত পূরণ হবে, তাদের ট্রন্টিনেম্যাব দেওয়া হবে।
সুইজারল্যান্ডের ওষুধ কোম্পানি রোশে এই ওষুধ তৈরি করেছে। ট্রন্টিনেম্যাব মস্তিষ্কে জমে থাকা অ্যামাইলয়েড প্ল্যাকের বিরুদ্ধে কাজ করে।
অ্যামাইলয়েড একটি বিষাক্ত প্রোটিন। এটি মস্তিষ্কে জমে কোষের কাজ ধীর করে দেয়। পরে কোষের মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় ট্রন্টিনেম্যাব আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। আলঝেইমারের শুরুর পর্যায় বা মৃদু জ্ঞানীয় দুর্বলতায় থাকা ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের মস্তিষ্কে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে অ্যামাইলয়েড প্ল্যাক পরিষ্কার হয়েছিল। ফলে আলঝেইমারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য দূর করার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে এই ফল থেকে এখনই বলা যায় না যে ওষুধটি ডিমেনশিয়া ঠেকাতে পারবে। অ্যামাইলয়েড প্ল্যাক পরিষ্কার করার পর রোগের বিকাশও থেমে যাবে কি না, সেটি এখনো অজানা। প্রিভেনট্রন ট্রায়ালের মূল লক্ষ্যই হলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
চিকিৎসার আগে প্রতিরোধের চেষ্টা
প্রিভেনট্রন ট্রায়ালের প্রধান গবেষক ও পরামর্শক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রামিন নিলফোরুশান বলেন, আলঝেইমার নিয়ে গবেষণার লক্ষ্য বদলাচ্ছে। এত দিন উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগটির চিকিৎসায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন উপসর্গ শুরুর আগেই রোগ ঠেকানো যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
তিনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর আলঝেইমার রোগের চিকিৎসা করা। প্রিভেনট্রন ভিন্ন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—উপসর্গ শুরু হওয়ার আগেই আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি কি না।’
নিলফোরুশানের মতে, এ ধরনের গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে আলঝেইমারে আক্রান্ত লাখো মানুষের উপকার করার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ট্রন্টিনেম্যাব এখনো পরীক্ষামূলক ওষুধ। এর কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়নি। দ্য টেলিগ্রাফ-কে নিলফোরুশান বলেন, ‘আমি বলছি না, এই ট্রায়াল কোনো জাদু। এটি একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে—এটি কাজ করবে কি না।’
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

