প্লান্টার ফ্যাসাইটিস কী? প্লান্টার ফ্যাসাইটিস হলো পায়ের তলার একটি সাধারণ অথচ কষ্টদায়ক সমস্যা, যা মূলত গোড়ালির নিচের দিকে ব্যথা তৈরি করে। এটি ঘটে প্লান্টার ফ্যাসা নামক শক্ত ফাইব্রাস ব্যান্ড বা সুতাতে অতিরিক্ত চাপ ও মাইক্রো ট্রামা বা ইনজুরির কারণে।
প্লান্টার ফ্যাসা কী?
প্লান্টার ফ্যাসা (Plantar fascia) একটি মোটা সুতার মতো গঠন, যা আমাদের পায়ের গোড়ালির হাড় থেকে শুরু হয়ে পায়ের আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে এবং পায়ের ভেতরের দিকের অংশকে অনেকটা ধনুকের বাঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এটি হাঁটা ও দৌড়ানোর সময় ধাক্কা বা আঘাত শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোগের নামকরণ
প্লান্টার ফ্যাসাইটিসকে আগে শুধু প্রদাহজনিত রোগ হিসেবে বিবেচিত করা হতো। কিন্তু বর্তমান গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এটি অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে টিস্যুর ক্ষয়জনিত রোগ হয়। এজন্য বর্তমান এই রোগটিকে প্লান্টার ফ্যাসাইটিস না ডেকে বরং প্লান্টার ফেসিওসিস বলা হয়।
কেন এবং কাদের হয়?
– স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন
– পায়ের অতিরিক্ত ব্যবহার
– দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কাজ করা
– হঠাৎ বেশি হাঁটা বা দৌড়ানো
– শক্ত মেঝেতে কাজ করা
– ভুল জুতা বা খালি পায়ে হাঁটা বা হিল জুতা পরা
– চ্যাপ্টা পা (ফ্ল্যাট ফুট)
– জন্মগত পায়ের রগ শক্ত বা ছোট হয়ে থাকা কিংবা পায়ের গঠনগত সমস্যা থাকা।
– দৌড়বিদ, ফুটবল প্লেয়ার
– দীর্ঘসময়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয় এমন কোনো পেশা। যেমন, ট্রাফিক পুলিশ, বাসের কন্ডাক্টর, বাসার গৃহিণী, যারা দীর্ঘসময়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরকম মানুষদের এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এই রোগকে পুলিশ ম্যান্স হিলও (পুলিশের গোড়ালি) ডাকা হয়।
এই রোগ পুরুষের তুলনায় মহিলাদের বেশি হয়ে থাকে; প্রায় দ্বিগুণ।
উপসর্গ
প্লান্টার ফ্যাসাইটিসের সবচেয়ে ক্লাসিক উপসর্গ হলো সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে পা ফেলতেই তীব্র গোড়ালির ব্যথা অনুভূত হয় এবং কিছুক্ষণ হাঁটার পর ব্যথা কমে যায়। এমনকি দীর্ঘসময় বসে থাকার পর আবার দাঁড়ালেও ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
রোগ নির্ণয়
এই রোগ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত কোনো বিশেষ পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক রোগীর ব্যথার ধরন এবং পা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারেন। তবে পায়ের অন্যান্য কিছু রোগ, যেমন চাপজনিত ফ্র্যাকচার, মরটন্স নিউরোমা, টারসাল টানেল সিনড্রোম রোগ চিন্তা করলে কখনো কখনো পায়ের এক্সরে, আল্ট্রাসাউন্ড, এমআরআই বা নার্ভ কন্ডাকশন টেস্টের মতো পরীক্ষা করা যেতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
অস্ত্রোপচারবিহীন বা কনজারভেটিভ চিকিৎসা (৯০% রোগী ভালো হয়)
– জীবনযাত্রার পরিবর্তন অর্থাৎ যেসব পেশা বা কাজের কারণে এই রোগ হচ্ছে, সেগুলো না করে বিশ্রাম নেওয়া।
– স্বল্প সময়ের জন্য ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা।
– ফ্যাসা প্রসারণ (স্ট্রেচিং) ব্যায়াম করা।
– ১৫-২০ মিনিট আইস বা বরফ সেক দেওয়া।
– রাতের বেলা স্পিলিন্ট ব্যবহার।
– তাছাড়া শক্ত জুতা পরিহার করে নরম জুতা ব্যবহার এবং সিলিকন হিল প্যাড ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়।
এগুলো ছাড়াও আক্রান্ত জায়গায় স্টেরয়েড ইনজেকশন একটি খুব ভালো চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী ব্যথামুক্ত থাকে।
অন্যান্য চিকিৎসা
– উচ্চশক্তির শব্দতরঙ্গ ব্যবহার (এক্সট্রাকরপোরাল শকওয়েভ থেরাপি)
– পিআরপি থেরাপি চিকিৎসা করার সুযোগ আছে।
যাদের উপরোক্ত পদ্ধতিতে ভালো হচ্ছে না, তাদের সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে (১–২ শতাংশ ক্ষেত্রে)। ৬ থেকে ১২ মাসে উপরোক্ত চিকিৎসা ব্যর্থ হলে, সেক্ষেত্রে ওপেন বা এন্ডোসকপিক (ছোট ছিদ্রে) সার্জারির সুযোগ রয়েছে। এই রোগ প্রতিরোধে কী করা যেতে পারে?
– সঠিক জুতা ব্যবহার/একই জুতা দীর্ঘদিন না ব্যবহার করা।
– ওজন নিয়ন্ত্রণ।
– হঠাৎ বেশি হাঁটা/দৌড়ানো এড়িয়ে চলা।
– দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়া।
– সকালে বিছানা থেকে নামার আগে পা স্ট্রেচিং করা।
– খালি পায়ে বা শক্ত জায়গায় না হাঁটা।
– তাছাড়া মাংশপেশি/রগ বা পায়ের গঠনগত কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলোর চিকিৎসা করা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি)
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

