আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে ২০২৫

সুস্থ মুখে সুস্থ মন

ডা. মো. ফারুক হোসেন

সুস্থ মুখে সুস্থ মন

সারা বিশ্বে প্রতি বছর ২০ মার্চ ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে একযোগে পালিত হয়। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য জনগণকে সচেতন করে তোলা, যেন মুখের রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে’র ক্যাম্পেইন থিম বা প্রচারণর বিষয়—‘A happy mouth is a happy body.’ অর্থাৎ সুস্থ মুখে সুস্থ শরীর। সুস্থ মুখ শুধু স্লোগান নয়, বরং এটি জীবনের চলার একটি দিকনির্দেশনা, যা আমাদের সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। সেই ধারাবাহিকতায় ওয়ার্ল্ড ডেন্টাল ফেডারেশন (এফডিআই) ২০২৫ সালে ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে’র মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে—‘A happy mouth is a happy mind.’ অর্থাৎ সুস্থ মুখে সুস্থ মন। মুখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানসিক সুস্থতার যোগসূত্র রয়েছে। স্বাস্থ্যবান মুখ হলো স্বাস্থ্যবান শরীরের প্রতিচ্ছবি। একটি স্বাস্থ্যবান মুখ আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। মানসিক উন্নতির জন্য মুখের যত্ন নিতে হবে। আপনার যদি মুখে যন্ত্রণাদায়ক রোগ থাকে, আঁকাবাঁকা দাঁত থাকে, অথবা মুখের কারণে আপনাকে দেখতে ভালো না লাগে, তাহলে সেটি আপনার মনের ওপর প্রভাব ফেলবে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে আপনি মন খুলে হাসতে পারবেন না, কথা বলতে পারবেন না। এককথায় আপনি মানসিকভাবে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বেন। তাই সুস্থ মুখ সুস্থ মন-মানসিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আপনার মুখের স্বাস্থ্যকে কখনোই আপনি বাকি শরীর থেকে আলাদা করতে পারবেন না। হৃদরোগ এরই মধ্যে শীর্ষ ঘাতক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা মাড়ি রোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সম্প্রতি জরিপে দেখা গেছে, মাড়ি রোগের ব্যাকটেরিয়া ইসোফেজিয়াল ক্যানসার বা টিউমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাড়ি রোগের মাধ্যমে যদি ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে সংক্রমিত হয়, তাহলে হার্টের ভাল্ব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো লিভারের রোগের সঙ্গে পেরিওডন্টাল রোগের যোগসূত্র রয়েছে। পেরিওডন্টাইটিসের সঙ্গে লিভারের রোগ ‘নন-অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ’-এর যোগসাজশ আছে। আর তাই লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ক্রনিক লিভার ডিজিজে দাঁত ও মাড়িতে সবুজ দাগ এবং অ্যানামেল হাইপোপ্লাসিয়া দেখা যেতে পারে। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস মুখের অভ্যন্তরে জেনিটাল ওয়ার্টস বা গোটার সৃষ্টি করে থাকে। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাসের কারণে মুখের ক্যানসার ও সারভাইক্যাল ক্যানসার হতে পারে। ‘হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ ১৬’-কে মুখের ক্যানসারের রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে গণ্য করা হয়। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেয়েদের মাসিকের সময় মুখে আলসার ও জ্বালাপোড়া হতে পারে। আবার মাসিক বন্ধ হয়ে গেলেও মেনোপজের সময় মুখে আলসার বা ক্ষত দেখা দিতে পারে। ডাউন সিনড্রোমের শিশুদের জন্মের সময় জিহ্বায় ফোলা ভাব থাকতে পারে। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের কারণে মুখে ও ঠোঁটে বারবার জ্বরঠোসা ও ক্ষত দেখা দিতে পারে। যাদের প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই মুখে নানা ধরনের আলসার বা ঘা দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের অভাব হলে ঠোঁটকাটা ও তালুকাটা শিশু জন্মগ্রহণ করতে পারে। মাড়ি রোগ থাকলে গর্ভের শিশু নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নিতে পারে। প্রি-ম্যাচিউর বেবি জন্ম নিলে বাচ্চার ওজন কম হবে, শ্বাসকষ্ট হবে এবং শিশু কানে কম শুনতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, যেহেতু শিশুর হাইপোথ্যালামাসের গঠন তখনো ঠিকভাবে হয় না। মাড়ি রোগের কারণে কারো কারো ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অ্যাবরশন হতে পারে। অথচ গর্ভকালে শুধু গর্ভবতী মায়ের ভালোভাবে দাঁতের স্কেলিং করিয়ে নিলে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে মাড়ি রোগজনিত কোনো জটিলতা দেখা দেবে না।

বিজ্ঞাপন

মুখের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে আপনার সার্বিক স্বাস্থ্য কখনোই ভালো রাখা সম্ভব নয়। মুখের স্বাস্থ্য ভালো না রাখলে বিভিন্ন ধরনের সিস্টেমিক রোগ থেকে শুরু করে জটিল রোগ হতে পারে, যে কারণে আপনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই আপনার দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যবান জীবন লাভ এবং হাসিখুশিপূর্ণ মানসিক জীবনের জন্য আপনার মুখের যত্ন নিন। হাসি আপনাকে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। আর সুস্থ মুখ মানেই সুন্দর হাসি।

লেখক : মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ

ইমপ্রেস ওরাল কেয়ার, ইব্রাহিমপুর, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন