ফারিয়া বিনতে রহমান জুলাইয়ের শুরুর দিকে হঠাৎ গিয়েছিলেন টিএসসিতে। শাহবাগে তখন কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ বইছিল। সেই ঢেউয়ে নিজের অজান্তেই গা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ফারিয়া। দাবি আদায়ের প্রতিবাদী মিছিলে কণ্ঠ মিলিয়ে সংহতি জানিয়েছেন প্রতিবাদে। তখনো ভাবেননি এই আন্দোলনই একদিন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে।
৭ জুলাই ঢাকা কলেজের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নেন ফারিয়া। দিন যত গড়িয়েছে, তিনি নিজেকে আন্দোলনের সঙ্গে তত বেশি জড়িয়েছেন। প্রথম দিকে মুখে মাস্ক পরে কিছুটা ভয় নিয়েই স্লোগানে কণ্ঠ মেলাতেন এক কোনায় দাঁড়িয়ে। পরিচিতদের মধ্যে তেমন কারো দেখা না পেলেও তার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
একবার রোদে দাঁড়িয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ফারিয়া, কিন্তু শারীরিক দুর্বলতা তাকে থামাতে পারেনি। সহপাঠীদের রাজপথে যোগ দিতে আহ্বান জানালেও বেশিরভাগ সময়েই পেয়েছেন কটাক্ষ। তিনি জানান, পরীক্ষার সময় যখন সবাই ইনকোর্স দিচ্ছিল, তিনি পরীক্ষা বয়কট করে রাজপথেই ছিলেন। একা দাঁড়িয়েও তিনি নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি।
হলের বাইরে একটি সাবলেট বাসায় ছিল তার বসবাস। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি শুধু তার বাবা জানতেন, যিনি ছিলেন তার একমাত্র ভরসা ও অনুপ্রেরণা। বাবা সবসময় বলতেন, যেখানেই যাও, সাবধানে থেকো।
পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠলে ফারিয়া বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যান। তবে তার সংগ্রাম থেমে থাকেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থেকে তিনি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলেছেন। এ সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পুরোনো বন্ধু তাকে হুমকি দিতে শুরু করেন-‘ফেসবুকে তুই কাঁপাচ্ছিস ঠিকই, কিন্তু নিজে সাবধানে থাকিস।’ কেউ কেউ পোস্ট মুছে ফেলতে বললেও তিনি তা করেননি, বরং প্রতিবাদের নীরব সাক্ষ্য হিসেবে সেগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
রাজপথের সঙ্গে ফারিয়ার সম্পর্ক নতুন নয়। স্কুলজীবনেও তিনি ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন এবং তনু হত্যার বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর ফারিয়া শহীদ ও আহতদের নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তার স্বপ্ন একটি নতুন বাংলাদেশ, যেখানে মজুর-কৃষক-শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং শোষিতেরা পাবে মর্যাদা।
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে কবর দিয়েছি। আর কোনো নতুন ফ্যাসিজম গড়ে উঠতে দেব না।’
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ফারিয়া ভীষণ আশাবাদী। তিনি মনে করেন, পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, কিন্তু পথ এখনো দীর্ঘ। তার ভাষায়-‘আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে অপরাজনীতি, বৈষম্য, গুম, গণহত্যা কিংবা ফ্যাসিবাদী শাসনের কোনো স্থান থাকবে না। জনগণের ক্ষমতা থাকবে জনগণের হাতেই।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

