২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় নৃশংস হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এই হামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীকে বিশেষভাবে টার্গেট করে পেটানো হয়।
তাদেরই একজন সানজিদা আহমেদ তন্বী, যার রক্তাক্ত চেহারার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ছবিটি দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
তন্বী একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন। মনোবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে বর্তমানে তিনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তার বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায়। তার বাবার নাম মেজবাহউদ্দিন আহমেদ, মায়ের নাম সাহানারা বেগম। স্থানীয় এক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি শেষে তিনি মাদারীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবেই তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
আন্দোলনের সেই ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তন্বী বলেন, জুলাইয়ের শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। তবে ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা যখন শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করেন, তখন আন্দোলন বেগবান হয়। ওই দিন রাত ১০টায় শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে হলগুলোতে স্লোগান শুরু হয়। রাত ১১টার দিকে আমাদের রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা হল গেটে এসে জড়ো হই। তখন অন্যান্য হলের শিক্ষার্থীরাও রাজু ভাস্কর্যের সামনে আসতে শুরু করে। আমাদের হলের গেট তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। আমরা রাত সাড়ে ১১টায় তালা ভেঙে হল থেকে বেরিয়ে আসি। সেদিন আমরা নারী শিক্ষার্থীরা ড্রেস চেঞ্জ করারও সময় পাইনি। হলের ভেতরে যে সাধারণ পোশাক পরা হয়, সেগুলো পরিহিত অবস্থায় আমরা বেরিয়ে আসি। হাঁড়ি-পাতিল, বাসন, চামচ—ইত্যাদি হাতের কাছে যে যা পেয়েছি, সাউন্ড করার জন্য তা নিয়ে সবাই বের হই। চারদিক থেকে শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়। আমরা নারী শিক্ষার্থীরা সামনের সারিতে ছিলাম।
১৫ জুলাই দুপুর থেকে আমরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিই। ওই দিন ছাত্রলীগও একই স্থানে কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। তার মানে হামলার আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। তবে আন্দোলনকারীরা নির্ভীক, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও নাছোড়বান্দা ছিল। আমরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকি। বিকাল ৩টায় জানতে পারি বিজয় একাত্তর হলে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে। তারা আন্দোলনে যোগ দিতে চায়, কিন্তু ছাত্রলীগ তাদের বের হতে দিচ্ছে না। পরে আমরা তাদের উদ্ধার করার জন্য হলপাড়ার দিকে রওনা দিই। সূর্যসেন হলের সামনে গিয়ে দেখতে পাই, বিজয় একাত্তর হলের সামনের রাস্তায় ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। সেখানে অনেকে আহত হন—কারো নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে, কেউ লাঠির আঘাতে আহত, আবার ইট-পাটকেলের আঘাতে কারো মাথা ফেটে গেছে। তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এক পর্যায়ে হলপাড়ার দিক থেকে আমাদের ধাওয়া করে ছাত্রলীগ।
আমরা রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করি। একপর্যায়ে আমরা ভিসি চত্বরের সামনে পৌঁছাই। সেখানে বিভিন্ন দিক থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। তারা ইট-পাটকেল ছোড়ে, লাঠিপেটা করে। এমনকি দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি হামলা করে। ভিসি চত্বরের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বাসস্ট্যান্ড করে রাখা ছিল। ছাত্রলীগের হামলা থেকে বাঁচতে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ বাসের ভেতরে, কেউ নিচে, কেউ বাসের আড়ালে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ছাত্রলীগ আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। ওই জায়গা থেকে আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে বের করে ছাত্রলীগ।
আমি বের হওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলাম, তখন কয়েকজন আমাকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে একটা ইটের টুকরো আমার চোখের নিচে এসে লাগে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। আমার চশমার কাচ ভেঙে যায়। চশমা ছাড়া আমার দেখতে সমস্যা হয়। তাই তখন কী করব, কোন দিকে যাব, বুঝতে পারছিলাম না। যারাই সেখান থেকে বের হচ্ছিল, ছাত্রলীগ তখন তাদের লাঠিপেটা করছিল, আর বলছিল, ‘আর কোনোদিন আন্দোলনে আসবি, আসবি আর?’ পরে কোনোমতে আমি জহুরুল হক হলের সামনে আসি। সেখান থেকে আমাকে কয়েকজন ভাই রিকশায় উঠিয়ে দেন।
সানজিদার রক্তাক্ত চেহারার ছবি কলেজ ও জেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং এ ঘটনা অনেক শিক্ষার্থীকে সরাসরি রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করে। সানজিদা বলেন, ‘নারী শিক্ষার্থীদের বলিষ্ঠ অংশগ্রহণে আন্দোলন বেগবান হয়েছে। তাদের অংশগ্রহণ না থাকলে আন্দোলন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত না। আমার অংশগ্রহণ ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থের জন্য ছিল না। এই আন্দোলন ছিল বিবেকের তাড়নায়। অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকা আমার স্বভাব নয়।’
তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান সবার সম্মিলিত অর্জন। শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো উচিত। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে হবে এবং মানুষের কথা বলার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি নতুন ও স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।’
সানজিদা আহমেদ তন্বী শুধু একজন সংগ্রামী শিক্ষার্থী নন, তিনি একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। তিনি আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে ‘গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক’ পদে লড়বেন। তার অসীম সাহসিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে ছাত্রদল, বাগছাস ও তিন বাম সংগঠনসহ বেশ কয়েকটি প্যানেল তার জন্য পদটি ফাঁকা রেখেছে। তবে অন্য প্যানেল ও স্বতন্ত্র থেকে পদটি ফাঁকা না রাখায় ওই পদে ১১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। সানজিদা বলেন, ‘আমি লড়াই করেই জিততে চাই। নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করছি। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলে প্রচারে নামব। নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের ভোটের মর্যাদা রক্ষায় আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

