বিশ্বজুড়ে অন্য যেকোনো ক্যানসারের চেয়ে ফুসফুসের ক্যানসারে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন একটি আবিষ্কার করেছেন, যা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
চারটি মহাদেশজুড়ে কর্মরত ৮০ জনেরও বেশি গবেষকের একটি দল রক্তের মধ্যে এমন কিছু প্রোটিন শনাক্ত করেছেন, যা ক্যানসার নির্ণয়ের বা ডায়াগনোসিসের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগে নির্ভুলভাবে ফুসফুসের ক্যানসারের পূর্বাভাস দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক কিছু প্রমাণও পেয়েছেন, একটি বিদ্যমান বা প্রচলিত প্রদাহবিরোধী (অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি) ওষুধ এই প্রোটিনগুলোর উচ্চ ঘনত্বের উপস্থিতিতে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে, যেটিকে তারা প্রদাহের (ইনফ্ল্যামেটরি) সাথে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন।
রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রোটিনগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোনো পরীক্ষা বা টেস্ট ব্যবহারের উপযোগী করার আগে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, এবং এই ওষুধটি আসলেই ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধ করে কি-না, তা নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীদের এখনও একটি এলোমেলো বা নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল পরিচালনা করতে হবে।
তা সত্ত্বেও, গত বৃহস্পতিবার ‘সেল’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলকে বাইরের বিশেষজ্ঞরা একটি দীর্ঘকালীন জনস্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জনের দিকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল শুরুর বিন্দু বা ক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. ডগলাস আরেনবার্গ (যিনি এই গবেষণার সাথে জড়িত ছিলেন না) বলেন, ‘দীর্ঘ, দীর্ঘ সময় ধরে ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধ করাটা পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হয়ে ছিল।
তিনি বলেন, গবেষকেরা এমন একটি জৈবিক নির্দেশক বা বায়োলজিক্যাল মার্কার শনাক্ত করে থাকতে পারেন যা কেবল ঝুঁকির পূর্বাভাসই দেয় না, বরং প্রতিরোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট ওষুধ থেকে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনাও অনুমান করতে পারে।
গত দুই দশকে ফুসফুসের ক্যানসার চিকিৎসায় চিকিৎসা অঙ্গন অনেক অগ্রগতি করেছে, যার বড় একটি কারণ হলো স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম বা প্রাথমিক পরীক্ষা ব্যবস্থা যা ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করতে পারে এবং লক্ষ্যযুক্ত ওষুধ ও ইমিউনোথেরাপি যা শেষ পর্যায়ের রোগীদেরও জীবনকাল বাড়িয়ে দিতে পারে। তবুও, বিশ্বব্যাপী ফুসফুসের ক্যানসারই সবচেয়ে বেশি নির্ণয় হওয়া ক্যানসার এবং আক্রান্তদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও কম মানুষ রোগ নির্ণয়ের পর পাঁচ বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকেন।
যুক্তরাজ্যের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের একজন অনকোলজিস্ট ও ক্লিনিকাল ডিরেক্টর এবং এই গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ড. চার্লস সোয়ানটন বলেন, ‘আমার মতে, প্রতিরোধই হলো এর সমাধান।’
ড. সোয়ানটন ও পিএইচডি শিক্ষার্থী ড. তেজ পান্ডিয়াসহ অন্যান্য গবেষকদের নেতৃত্বে ইউকে বায়োব্যাঙ্ক থেকে ৪৮ হাজার রক্তের নমুনা নেওয়া হয় এবং ফুসফুসের ক্যানসার তৈরির সাথে জড়িত ১৪টি প্রোটিন শনাক্ত করতে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করা হয়। গবেষকেরা যখন সেই প্রোটিনগুলোর উপস্থিতির দিকে তাকান এবং একই সাথে রোগীর বয়স, ধূমপানের অবস্থা ও ফুসফুসের রোগের ইতিহাস বিবেচনা করেন, তখন তারা বর্তমানে ব্যবহৃত সেরা ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেলগুলোর চেয়েও আরো নিখুঁতভাবে কে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন তা পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হন।
গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে আরো আটটি অতিরিক্ত ডেটা সেটে এই ১৪-প্রোটিনের স্বাক্ষর বা বৈশিষ্ট্যটি যাচাই বা ভ্যালিডেট করেছেন, যার মধ্যে তাইওয়ানের একটি ডেটা সেটও ছিল যা মূলত এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল যারা কখনোই ধূমপান করেননি।
ইঁদুর এবং কোষের মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, যখন একটি নির্দিষ্ট প্রদাহজনিত পথ সক্রিয় হয় তখন এই প্রোটিনগুলো বৃদ্ধি পায়। ধূমপান এবং বায়ু দূষণ এই পথটিকে সক্রিয় করতে পারে।
এটি এই প্রমাণকে আরো জোরালো করে যে, কেবল ধূমপান, দূষণ বা অন্যান্য কারণের ফলে হওয়া জেনেটিক মিউটেশনই ফুসফুসের ক্যানসারকে চালিত করছে না। বরং ড. সোয়ানটন বলেন, এই ফলাফলগুলো ইঙ্গিত করে ধূমপান মিউটেশন এবং প্রদাহ উভয়ই সৃষ্টি করে, যা একসাথে ক্যানসার তৈরি করে।
তারা আরো দেখেছেন, যারা পরবর্তীতে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) এবং পালমোনারি ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যেও এই প্রোটিনের উপস্থিতি বেশি ছিল, যা এই তিনটি রোগেরই উৎস মূলে একটি সাধারণ প্রদাহজনিত পরিবেশের দিকে ইঙ্গিত করে।
এটি বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক, কারণ প্রদাহ এমন একটি বিষয় যা তারা ক্যানসার হওয়ার আগেই লক্ষ্য বা টার্গেট করতে পারেন। সেই ধারণাটি অন্বেষণ করতে গবেষকেরা ক্যানাকিনুম্যাব (canakinumab) ওষুধের একটি র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত ৪ হাজার ৬৫০ জন রোগীর অতীতের ডেটা পর্যালোচনা করেন, যা ওই ১৪-প্রোটিনের বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত একই প্রদাহজনিত পথকে লক্ষ্য করে কাজ করে। সেই ট্রায়ালটি হার্ট অ্যাটাক কমানোর ক্ষেত্রে সামান্য সুবিধা দেখালেও এটি দেখিয়েছিল, যে রোগীরা ওষুধটি নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ঘটনাক্রমে ফুসফুসের ক্যানসারের প্রকোপ কম ছিল।
গবেষকেরা দেখেছেন, ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ২ হাজার ৩০০ জন রোগী যাদের ওই ১৪টি প্রোটিনের উপস্থিতি গড় হারের চেয়ে বেশি ছিল, তাদের ক্ষেত্রে ক্যানাকিনুম্যাব ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে।
(ড. সোয়ানটন সম্প্রতি ক্যানাকিনুম্যাব-এর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নোভারটিস-এর বোর্ডে যোগ দিয়েছেন)।
ড. সোয়ানটন এই ওষুধের সম্ভাবনাকে স্ট্যাটিন-এর সাথে তুলনা করেছেন। চিকিৎসকেরা রোগীদের একটি নির্দিষ্ট মার্কার (উচ্চ এলডিএল কোলেস্টেরল) দেখে স্ট্যাটিন দিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন, যা তাদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।
ড. সোয়ানটন বলেন, ‘এটি ক্যানসারের জন্য এক ধরণের এলডিএল-এর সমতুল্য।’
বিজ্ঞানীদের এখনও আরো গবেষণার মাধ্যমে এই প্রোটিন বৈশিষ্ট্যটি যাচাই করা প্রয়োজন এবং রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারের জন্য একটি পরীক্ষা বা টেস্ট তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য ক্যানাকিনুম্যাব পরীক্ষা করার জন্য তাদের একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল চালাতে হবে।
ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের মেডিকেল অনকোলজি অ্যান্ড হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ড. রয় এস হার্বস্ট বলেন, ‘এটিই হলো বড় ‘যদি’। এটি কি চিকিৎসাগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে? আমরা কি ক্যানসার প্রতিরোধ করার জন্য সঠিক পর্যায়ে এটিকে পর্যাপ্তভাবে ব্লক করতে পারবো?’
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের একজন পালমোনোলজিস্ট ড. পিটার ম্যাজোনে বলেন, ক্যানাকিনুম্যাব-এর উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যার মধ্যে সংক্রমণ এবং সেপসিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত। এমনকি একটি সংকীর্ণ বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর ক্ষতিগুলো সুবিধার চেয়ে বেশি বিষাক্ত বা ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি বলেন, এটা সম্ভব যে অন্য একটি ওষুধ যা একই পথকে লক্ষ্য করে কাজ করে সেটি কার্যকর এবং নিরাপদ হতে পারে।
চিকিৎসার বাইরেও, এই প্রোটিন বৈশিষ্ট্যটি কম-ডোজের সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফুসফুসের ক্যানসার স্ক্রিনিং থেকে কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন সেই জনসংখ্যার পরিধি আরো ভালোভাবে নির্ধারণ করতে সাহায্য করতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সি এমন যেকোনো ব্যক্তির জন্য বার্ষিক স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেন, যাদের ২০ প্যাক-ইয়ার ধূমপানের ইতিহাস রয়েছে এবং বর্তমানে ধূমপান করেন বা গত ১৫ বছরের মধ্যে ধূমপান ছেড়েছেন।
কিন্তু ড. ম্যাজোনে বলেন, যারা এই স্ক্রিনিংয়ের যোগ্য তাদের অনেকেই স্ক্যান করান না। চিকিৎসকেরা যদি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পারেন, তবে তা আরো বেশি মানুষকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে সাহায্য করতে পারে। একটি রক্ত পরীক্ষা অন্যান্যদেরও চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে যারা যোগ্যতার মানদণ্ডের মধ্যে পড়েন না, কিন্তু বর্ধিত ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
ড. ম্যাজোনে বলেন, বিশেষ করে যারা কখনো ধূমপান করেননি তাদের ফুসফুসের ক্যানসার আরো ভালোভাবে শনাক্ত করার ‘বড় প্রয়োজন’ রয়েছে।
নতুন এই গবেষণাপত্রটি ইঙ্গিত করেছে, প্রোটিন বৈশিষ্ট্যের কিছু উপাদান ধূমপান না করা ব্যক্তিদেরও চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে, যারা ফুসফুসের ক্যানসারের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন, তবে এটি সম্ভব কি-না তা দেখানোর জন্য আরো ডেটা প্রয়োজন।
ড. হার্বস্ট বলেন, তার ৩০ বছরের কর্মজীবনে তিনি ফুসফুসের ক্যানসারকে একটি নিরাময় অযোগ্য রোগ থেকে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য অবস্থায় পরিবর্তিত হতে দেখেছেন।
তবে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সুবিধাটি এখনও আসবে এটিকে একদম প্রাথমিক পর্যায়ে ধরতে পারলে বা এমনকি এটি প্রতিরোধ করতে পারলে। এটি সেই দিকের একটি পদক্ষেপ।’
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


