আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে

খালেদা জিয়া সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার

ফয়সাল আকবর

খালেদা জিয়া সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার

১৯৯১ সালের ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চারটি মৌলিক সংস্কার আনা হয়। প্রধানত সংস্কারটি হচ্ছে, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রবর্তন। এই একটি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সরকারি আয় ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। তখনো বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলো এবং বিরোধী দল যথারীতি হইচই শুরু করে দিয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্কারটি হচ্ছে মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধ প্রসার। ডি-ন্যাশনালাইজেশন পলিসির মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশে শুরু হলেও মূলত তা ১৯৯১-৯২ অর্থবছর থেকে প্রসার লাভ করে। এই একটি কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নতুন মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। তৃতীয় সংস্কারটি হচ্ছে বেসরকারীকরণ নীতি। বাংলাদেশের মতো জনবহুল রাষ্ট্রে সরকারি খাতের সমান্তরাল বেসরকারি খাতের প্রসার ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন একেবারেই অসম্ভব। এমন বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম বাজেটেই বেসরকারীকরণ নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যার ফলে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড এবং ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রাইভেটাইজেশন কমিশন। চতুর্থ সংস্কারটি হচ্ছে, ১৯৯১ সালে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে। দেশে যে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের সম্প্রসারণ ঘটেছে, সে ক্ষেত্রে এই নীতির বিশেষ ভূমিকা আছে। খালেদা জিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নেওয়া এই চারটি প্রধান সংস্কারের ওপর দাঁড়িয়ে মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আজকের অগ্রগতি। এ কারণে ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের স্বর্ণযুগ বলা যায়।

১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পর সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তুলে দেন সাইফুর রহমানের হাতেই। সাইফুর রহমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করে অর্থনীতিতে মৌলিক সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ১৯৯১-৯২ অর্থবছর থেকেই। এজন্য তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক থেকে উন্মুক্ত করতে কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা করেন। সাইফুর রহমানের এসব সংস্কার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পূর্ণ আস্থা ও রাজনৈতিক সমর্থন ছিল।

বিজ্ঞাপন

১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রবর্তনের ফলে সরকারি আয়ে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতীয় বাজেটের আকারও ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। যেমন ১৯৯০-৯১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মোট বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা, যাতে রাজস্ব আয় ছিল ৭ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে মোট বাজেটের আকার দাঁড়ায় ১৭ হাজার ২০০ কোটি টাকায় এবং রাজস্ব আয় ১০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকায়। এই অর্থবছর থেকে খালেদা জিয়া সরকার বাণিজ্য উদারীকরণের দিকে মনোনিবেশ করে এবং বিনিময়হার নীতি নমনীয় করে আমদানির ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা বাতিল করে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের শুল্ক কমানোর পরিবর্তে সব আমদানিপণ্যের ওপর শুল্ক সামগ্রিকভাবে হ্রাস করা হয়, যা বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেন ভিন্নমাত্রা যুক্ত করে এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯১ সালে দেশের আর্থিক খাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। বেসরকারীকরণ নীতির ফলে নতুন বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিদ্যমান বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও পুঁজি সঞ্চয়ের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। ডিরেগুলেশন নীতির কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উন্মুক্ত হয়, যার ফলে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান ক্রমেই সরকারি খাতকে ছাড়িয়ে যায়।

১৯৯১ সালের নতুন শিল্পনীতির ফলে দেশের শিল্প খাতে বড় পরিবর্তন আসে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পের সম্প্রসারণও ঘটে দ্রুত। ফলে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি গার্মেন্ট শিল্পের চরম বিকাশ ও প্রসার সম্ভব হয়। ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ফ্রান্সে পোশাক রপ্তানির মধ্য দিয়ে গার্মেন্ট শিল্পের অগ্রযাত্রা শুরু হলেও ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে তৈরি পোশাকের কারখানার সংখ্যা ছিল ৮৩৪টি। খালেদা জিয়া সরকারের মাত্র পাঁচ বছরে সেই সংখ্যা ১৯৯৬ সালে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৫৩টিতে, যা দেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ফলে দেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

সার্বিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ শাসনামল ছিল জাতীয় অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের স্বর্ণযুগ। এসব সংস্কারের ওপর দাঁড়িয়ে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা আমাদের একটি তলাবিহীন ঝুড়ির রাষ্ট্র থেকে বের করে এনে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি পেতে অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছে। এজন্য বেগম খালেদা জিয়াকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও অগ্রগতির পথিকৃৎ বলা যায়।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...