মসজিদে নববির স্মৃতি

মাহফুজুর রহমান সা’দ

মসজিদে নববির স্মৃতি

লোকে লোকারণ্য মসজিদে নববি। একের পর এক জনস্রোত প্রবেশ করছে নবী আঙিনায়। কেউ জিকিরের হিমেল দুনিয়ায় বিচরণ করছে, কেউ পরম তৃপ্তি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বরকতময় এই মাহফিলে, কেউবা আবার নির্মল-বিশুদ্ধ জমজম পান করছে মধুর মতো। ​আমি মৌমাছির মতো ছোট একটা জামাত দেখে সেখানে বসে পড়লাম। একঝাঁক নির্মল চোখ চেয়ে আছে একটি কেন্দ্রের দিকে। আমার চোখের আলোও সেদিকে গিয়ে পড়ল। একজন শায়খ হাদিস পড়াচ্ছিলেন, যার দুই চোখ অন্ধ। ‘অন্ধ’ মানে তিনি কোনো দিন সূর্যোদয় দেখেননি; দেখেননি জেদ্দা সাগরের উচ্ছ্বসিত তরঙ্গমালা কিংবা মদিনার চঞ্চল বিড়াল ও কবুতরের ঝাঁক। স্রেফ হাতে স্পর্শ করে করে তিনি দেদার হাদিস পড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আমার দুচোখ তখন আশ্চর্যের সাগরে সাঁতার কাটছিল! কী দারুণ দৃশ্য—আলোওয়ালারা আজ চোখের আলোহীনের কাছে গভীর আগ্রহ নিয়ে হাদিস পড়ছে। আল্লাহ মাঝেমধ্যে মানুষকে এমন ভেতরের আলো দেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চমৎকারভাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস পড়িয়ে যাচ্ছিলেন তিনি, আর আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম।

​মানুষের প্রতিভা কী অপরূপ হতে পারে! ব্যাপারটা অনুধাবন করতে হলে একটু কল্পনায় অতীতে ফিরে যেতে হবে। ধরুন, একটা ছেলের শৈশব, কৈশোর আর যৌবন কাটল চির অন্ধকারের সঙ্গে সন্ধি করে। দিকে দিকে শুধু প্রতিকূলতার উপচে পড়া ঢেউ; কূলহীন এক সাগর, যার তীর খুঁজে পাওয়াই দায়। এমন পরিস্থিতিতেও সেই ছেলেটি দমে না গিয়ে ভাবল এই তীরহারা সাগরের কূল তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। এ অবস্থাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন হাদিস শরিফে বিশেষজ্ঞ হওয়ার। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি সানাবিয়া (উচ্চমাধ্যমিক) শেষ করলেন। ভালো মানের একটা জামাতে হাদিস পড়লেন। হাজারো ঝঞ্ঝা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে অবশেষে তিনি হলেন একজন ‘মুহাদ্দিস’। আজ তিনি মসজিদে নববির মতো পুণ্যময় স্থানে যেখানে আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ ﷺ তাঁর সাহাবিদের দরস দিতেন সেখানে বসে চর্মচক্ষুর আলোওয়ালা মানুষদের পড়াচ্ছেন নিজের সিনার আলো দ্বারা। কী আজব, কী বিস্ময়কর!

বিজ্ঞাপন

​তিনি তার দরসে আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর সেই বিখ্যাত হাদিসটি বলছিলেন ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের প্রাধান্য নেই, অনুরূপভাবে অনারবের ওপরও কোনো আরবের প্রাধান্য নেই। আল্লাহর কাছে সেই সবচেয়ে সম্মানিত, যিনি তাকওয়ার শোভায় সজ্জিত।’

​কী একটা কাজের জন্য বাইরে গেলাম। এশার সালাত শুরু হতে তখনো কিছুটা সময় বাকি। কাজ শেষে ফিরে এসে দেখি, স্ক্রিনে লেখা উঠছে—মসজিদ মুসল্লিতে ভরে গেছে। তৎক্ষণাৎ আমি মসজিদের বাইরের কাতারে গিয়ে দাঁড়ালাম।

​ইমাম সাহেবের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে একযোগে সবাই হাত বাঁধল। সম্মানিত মুসল্লিরা নিমেষেই ডুবে গেলেন নামাজের অতল প্রশান্তিতে। যেখানে উসমান ইবনে আফফান (রা.), জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-সহ অসংখ্য সাহাবি নামাজ আদায় করতেন, সেই মোহনীয় পরিবেশে মহান আল্লাহ আমাকেও নামাজ আদায়ের পরম সুযোগ দিলেন।

​নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই আমার পাশে বসা এক আলজেরিয়ান ভাই আমার হাত ধরলেন। আমার দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ঘুরে গেল। তিনি কোনো মুকাদ্দামা ছাড়াই আমাকে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আল্লাহর কাছে তাওবা করলে আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেনÑ

​إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

​অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য যেকোনো গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন।’ (সুরা আন-নিসা : ৪৮)

​একটু ভাবুন, তিনি এসেছেন কোন দুনিয়া থেকে আর আমি গিয়েছি কোত্থেকে! ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কত শত পার্থক্য আমাদের মধ্যে। অথচ এসব পার্থক্যের বাইরে, একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সুবাদে আমরা মুহূর্তেই এক হয়ে গেলাম। এই অল্প সময়ের দেখায়ও আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহর কথা তিনি ভুলে যাননি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।’ তিনি এই সংক্ষিপ্ত সুযোগেই তা করে দেখালেন। তার সঙ্গে আমার জীবনে আর কোনো দিন দেখা হবে না—এটি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু আমি যখনই আমার বন্ধুদের মদিনার গল্প শোনাব, তার এ কথাটা আমি বলবই বলব। এতে করে যদি কোনো একজনের চিন্তাতেও সামান্য পরিবর্তন আসে, তবে এর সওয়াব তো তিনিও পাবেন। দাওয়াতের এটাই এক চমৎকার সৌন্দর্য ও সুবিধা।

​বেশ লম্বা সময় কথা বলার পর আমরা কথোপকথনের উপসংহারে পৌঁছালাম। আমার পকেটে থাকা একটা বিস্কুটের প্যাকেট তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘এটা তোমার জন্য হাদিয়া।’ (যদিও এটা নবী আঙিনাতেই অন্য একজনের কাছ থেকে আমি উপহার পেয়েছিলাম)। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন এবং মদিনার তিনটি খেজুর দিলেন। আমিও তার জন্য দোয়া করলাম। ​তখন একটি গভীর উপলব্ধি হলো—দিলে পাওয়া যায়। যদি মানুষের বেলায় এমন হয়, তাহলে পরম করুণাময় আল্লাহর বেলায় তা কেমন হতে পারে?!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...