ধোঁয়ায় ঢেকে আছে শহরটা। বাতাসে বারুদের গন্ধ। ভাঙা ইট-পাথরের ধুলো উড়ছে চারদিকে। কোথাও ভাঙা দেয়াল; কোথাও পুড়ে যাওয়া বাড়ি। কোনো জানালার কাচ ভাঙা; কোনো দরজা আধখোলা অবস্থায় বাতাসে দুলছে। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও মিসাইল বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে। একটা গম্ভীর কাঁপন ধরানো শব্দ, যা শুনলে মনে হয় পুরো শহরটাই যেন কেঁপে উঠছে।
রাস্তার ওপর মানুষজন তাড়াহুড়ো করে হাঁটছে। কারো হাতে ছোটো ব্যাগ; কারো কাঁধে ছোট্ট শিশু। কেউ দৌড়ে আশ্রয় খুঁজছে; কেউ আতঙ্কিত চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে। এই শহরে এখন কারো কাছে কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। সবাই নিজের জীবন বাঁচানোর তাড়নায় ছুটে চলেছে।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই ধুলোমাখা এক রাস্তায় একা ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা কুকুর। গায়ে ধুলো জমে আছে। লোমগুলো এলোমেলো। ক্লান্ত চোখে সে চারদিকে তাকায়, যেন কাউকে খুঁজছে। তার মুখে ধরা একটা ছোট্ট ছেঁড়া জুতো। জুতোটার রঙ একসময় হয়তো উজ্জ্বল ছিল, এখন তা মলিন হয়ে গেছে। ফিতেটা ছিঁড়ে গেছে। একপাশে একটু ফাটলও ধরেছে। তবুও কুকুরটা সেটাকে খুব যত্ন করে ধরে রেখেছে, যেন এটা তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো জিনিস।
এই জুতোটার মালিক ছিল একটা ছোট্ট ছেলে। কুকুরটা বারবার রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যায়। কখনো ধীরে হাঁটে। কখনো একটু দৌড় দেয়। মাঝে মাঝে থেমে দাঁড়ায়। মাথা উঁচু করে চারদিকে তাকায়। তার চোখে এক অদ্ভুত প্রত্যাশা—যেন সে কাউকে চিনে ফেলবে, কেউ তাকে ডাকবে। হয়তো তার মনে পড়ছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন এই রাস্তাতেই সে খেলত। ছোট্ট সেই ছেলেটা দৌড়ে দৌড়ে তার সঙ্গে খেলত। কখনো একটা বল ছুড়ে দিত। কখনো তার গলায় হাত রেখে হাসত। কুকুরটা লেজ নেড়ে তার পাশে পাশে হাঁটত। ছেলেটা যখন স্কুলে যেত, সে দরজার সামনে বসে অপেক্ষা করত। আর বিকালে যখন সে ফিরত, তখন কুকুরটা আনন্দে লাফিয়ে উঠত।
সেই ছেলেটার পায়েই ছিল এই ছোট্ট জুতোটি। খেলার সময় কখনো দৌড়াতে গিয়ে ছেলেটার পা থেকে একটা জুতো খুলে পড়ে যেত। তখন সে হাসতে হাসতে বলত, ‘এইটা তুলে আনো তো!’ কুকুরটা দৌড়ে গিয়ে জুতোটাকে মুখে করে তুলে আনত। ছেলেটা খুশি হয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। আজও হয়তো সে সেই খেলার কথাই ভাবছে। হয়তো সে ভাবছেÑএই বুঝি তার ছোট্ট মালিক দৌড়ে এসে বলবে, ‘এই তো আমি। আমার জুতোটা দাও।’
কিন্তু আজ রাস্তা ফাঁকা। কেউ আসে না। শহরের শব্দগুলোও যেন আজ অন্যরকম। হাসির শব্দ নেই। ছোটদের খেলাধুলার আওয়াজ নেই। আছে শুধু দূরে মিসাইল বিস্ফোরণের শব্দ। আর মাঝে মাঝে অ্যাম্বুলেন্সের কলজে-কাঁপানো সাইরেন। কুকুরটা একটু হাঁটে। আবার থামে। তারপর আবার হাঁটে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে ধীরে ধীরে রাস্তার ধারে এসে বসে পড়ে। সে ছোট্ট জুতোটাকে আলতো করে নিজের দুপায়ের মাঝে রেখে দেয়, যাতে ওটা হারিয়ে না যায়। তারপর সে শান্ত হয়ে বসে থাকে—যেন সে অপেক্ষা করছে; হয়তো তার ছোট্ট বন্ধুটা আসবে।
সে তো যুদ্ধ বোঝে না। সে বোঝে না, মিসাইল কী? বোঝে না, কেন হঠাৎ আকাশে আগুন জ্বলে ওঠে? কেন মানুষজন আতঙ্কে দৌড়ায়? সে জানে না, কেন একদিন হঠাৎ তার চারপাশের সবকিছু বদলে গেল? সে শুধু জানেÑএকটা ছোট্ট হাত প্রতিদিন তার মাথায় পরশ বুলিয়ে আদর করত। একটা ছোট্ট কণ্ঠ তাকে মায়াভরে ডাকত। একটা ছোট্ট মানুষ তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল। আজ সেই হাতটি নেই। সেই কণ্ঠ নেই। সেই বন্ধুটাও নেই। চারদিকে শুধু আশ্চর্য নীরবতা।
কুকুরটা মাঝে মাঝে মাথা তুলে রাস্তার দিকে তাকায়। দূরে কেউ হাঁটলে সে একটু নড়েচড়ে ওঠে; যেন মনে হয়Ñএই বুঝি ছেলেটি এসেছে। কিন্তু আবার বুঝতে পারে, আসলে সে নয় ওটা। তারপর আবার শান্ত হয়ে সে বসে পড়ে।
আমরা যখন যুদ্ধের খবর শুনি, তখন আমরা সংখ্যা শুনি। কতজন মানুষ মারা গেল, কতজন আহত হলো, কতগুলো বাড়ি ধ্বংস হলোÑএসব হিসাব আমরা রাখি। কিন্তু এই অবলা প্রাণীগুলোর কথা কি কেউ ভাবে? যে পাখির বাসাটা ভেঙে গেল, যে বিড়াল তার মালিককে হারাল, যে কুকুর তার ছোট্ট বন্ধুটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেÑতাদের কষ্টের হিসাব কে রাখে?
যুদ্ধ শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, অসংখ্য নীরব সম্পর্ক ভেঙে দেয়। একটা শিশুর সঙ্গে একটা কুকুরের বন্ধুত্বÑএটা কোনো বড় খবর নয়। কোনো সংবাদপত্রে তার কথা ছাপাও হবে না কোনোদিন। কিন্তু সেই সম্পর্কও তো একদিন সত্যি ছিল, গভীর ছিল। আজ সেই সম্পর্কের একপাশ নেই।
তবুও কুকুরটা অপেক্ষা করছে। রাস্তার ধারে বসে আছে সে। ধুলো উড়ছে। বাতাস বইছে। দূরে আবার কোথাও মিসাইল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সে কিছুতেই নড়ছে না। তার পায়ের মাঝে রাখা সেই ছেঁড়া জুতোটাকে সে এখনো আগলে রেখেছে। হয়তো তার ছোট্ট হৃদয়ে এখনো একটা বিশ্বাস কাজ করছেÑএকদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন আবার সেই ছোট্ট পায়ের শব্দ শোনা যাবে। একদিন আবারও কেউ হাসতে হাসতে বলবে, ‘এই তো আমি। আমার জুতোটা দাও।’
আর তখন সে আনন্দে লেজ নেড়ে দৌড়ে যাবে ওর কাছে। কারণ কুকুরটি এখনো ভুলে যায়নি যে, ভালোবাসা মানে অপেক্ষা করা। তাই এখনো বসে আছে সে রাস্তার ধারে। এখনো অপেক্ষা করছে সেই ছেঁড়া জুতোটাকে আঁকড়ে ধরে। হয়তো সে এখনো বিশ্বাস করে একদিন না একদিন তার ছোট্ট মালিক নিশ্চয়ই ফিরে আসবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

