কাশফুল তুলতুল

কাশফুল তুলতুল

মুনিয়াদের বাড়ির ছোট্ট বাগানটাতে এমনিতেই সবসময় নানা জাতের ফুলে ছেয়ে থাকে। হঠাৎ আজ বিকালে পূর্বকোনায় গিয়ে বিষয়টা নজরে আসে ওর। সাদা সাদা লম্বাটে ফুল ফুটে আছে ঘাসের ডগায়। এ রকম ফুল ও এর আগে দেখেছে বইয়ের পাতায়। কাশফুল।

মুনিয়ার খুব ভালো লাগে। খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করে।

বিজ্ঞাপন

মুরাদ ফিরল সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে। অমনি মুনিয়াটা ভাইয়ার কোলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলল, ‘জানো ভাইয়া, আমাদের বাগানে কাশফুল ফুটেছে।’

মুরাদ জানে বিষয়টি। কিন্তু সেটা বলে বোনের খুশিটাকে ম্লান করে দিতে চাইল না। বলল, ‘সত্যি! খুব সাদা ফুল, তাই না?’

মুনিয়ার উচ্ছ্বাস এবার উপচে পড়ার জোগাড়, ‘একেবারে দুধসাদা!’

মুরাদ বইয়ের ব্যাগটা রেখে ওই অবস্থায় বাগানে ছুটল বোনের সঙ্গে।

বেশ লাগছে তিন গোছা কাশফুল। একেক গোছায় চার-পাঁচটা করে কাশফুল ফুটেছে।

একটা টুনটুনি পাখি উড়ছিল ফুলগুলোকে মাঝে রেখে। ওদের দেখে পাশের ডুমুরি গাছে বাসায় গিয়ে বসল। মুনিয়া ইশারায় পাখিটাকে অভয় দিল। আর ওটা মুনিয়ার দিকে কেমন করে তাকিয়ে রইল।

ভাই-বোনের আনন্দ দেখে আম্মু এবং দাদুভাইও চলে এসেছেন বাগানে। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ওদের উচ্ছ্বলতা উপভোগ করছেন আর নিজেরাও দারুণ পুলকিত হচ্ছেন। তারাও যেন এই মুহূর্তে তাদের ছেলেবেলায় হারিয়ে গেছেন।

মুনিয়াই প্রথমে দেখতে পেল তাদের। কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘দাদুভাই-আম্মু, তোমরাও এসেছো? দেখ দেখ, কী সুন্দর কাশফুল ফুটেছে! আচ্ছা দাদু, কাশফুল সারা বছর ফোটে না কেন?’

দাদুভাই মৃদু হাসলেন। তিনি জানেন, এই ছেলেমেয়েদের কাছে এলে অবশ্যই তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই আসতে হবে। তিনি বললেন, ‘বেশ ভালো বিষয়ে জানতে চেয়েছ। শোনো তাহলে। কাশফুল ছোটদিনের উদ্ভিদ। মানে, যখন দিনের দৈর্ঘ্য ছোট ও রাতের দৈর্ঘ্য বড় হয়, তখন এই ফুল ফোটার হরমোন সক্রিয় হয়। বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এটা দেখা যায়। যে কারণে বর্ষাকালের ঠিক পরে শরতের শুরুতে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ফুলগুলো ফোটে। বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টির কারণে কাশগাছ পর্যাপ্ত পানি পেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আর শরতের শুরুতে মাটিতে যে আর্দ্রতা থাকে, তা কাশের ফুল ফোটাতে সাহায্য করে। এখন শুনে নাও কাশফুলের কিছু ঔষধি গুণের কথা। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় কাশগাছের মূল বা শিকড় পিত্তথলি এবং কিডনির পাথর নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। মূত্রবর্ধক, প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং প্রস্রাব পরিষ্কার করতেও বেশ কার্যকর এর মূল। মূল বেটে চন্দনের মতো গায়ে মাখলে শরীরের অতিরিক্ত ঘাম ও অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ দূর হয়। এছাড়া ব্যথানাশক ও ফোড়ার চিকিৎসা, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং পাইলসের সমস্যায়ও এটা ব্যবহার করা যায়।’

সব শুনে মুনিয়ার চোখজোড়া ইয়া বড় বড় হয়ে গেল।

মুরাদও এগুলো আজ প্রথম জানল। আসলে ওদের দাদুভাইটা জ্ঞানের একটা আধার! কত কিছুই জানেন তিনি!

‘দাদুভাই, তোমার না কিছু জমি আছে তরফ নওয়াপাড়ার মাঠে? ওখানে নিশ্চয়ই অনেক কাশফুল ফুটেছে। নিয়ে যাবে আমাদের?’ আবদারের সুরে বলল মুনিয়া। সমর্থনের আশায় তাকাল ভাইয়ার দিকে।

মুরাদ মাথা নেড়ে সায় জানাল।

দাদুভাই বললেন, ‘আগামীকাল তো শুক্রবার, তোমাদের স্কুল বন্ধ। আমরা কালই যাব ইনশাআল্লাহ।’

খুশিতে ঝলমল করে উঠল মুনিয়ার মুখটা। কী মজা! কাল অনেক কাশফুল দেখবে ও! হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবে তুলার মতো নরম ফুলগুলো। ওগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো মৌমাছি, ঘাসফড়িং, প্রজাপতি আর অন্যান্য বিচিত্র রঙের পোকামাকড়ের সঙ্গে খেলবে। ভাবতেই আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে।

মুরাদেরও বেশ ভালো লাগছে। অনেক দিন বাইরের খোলা জায়গায় যাওয়া হয় না। আব্বুও নিশ্চয়ই থাকবেন সঙ্গে।

সে রাতে মুরাদ এবং মুনিয়া ঘুমের ভেতর মজার স্বপ্ন দেখল। পরদিন পুরো পরিবার গেল কাশফুল দেখতে।

সারাদিন অনেক মজা করল সবাই। ফেরার সময় দুহাতভর্তি কাশফুল উঠিয়ে নিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন