মেঘলা দিনের ক্লাসরুম

মেঘলা দিনের ক্লাসরুম

সকাল থেকেই আকাশ মেঘে ঢাকা। সূর্যের আলো যেন ধূসর মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে, বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির মিষ্টি গন্ধ। ছোট্ট অনিক ছাতা মাথায় দিয়ে আনন্দে স্কুলের পথে হাঁটতে লাগল। বৃষ্টির দিনে স্কুলে যেতে তার খুব ভালো লাগে।

শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে সে দেখল, বন্ধুরাও একে একে এসে গেছে। জানালার বাইরে মেঘগুলো এত নিচু হয়ে নেমে এসেছে যে মনে হচ্ছে, একটু হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে।

বিজ্ঞাপন

কিছুক্ষণ পর নীলিমা ম্যাডাম ক্লাসে এলেন। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল; ফ্যান থেমে গেল, আলো নিভে গেল। ঘরটা একটু অন্ধকার হয়ে উঠতেই কেউ বলল, ‘আজ তো আর পড়াশোনা হবে না!’

ম্যাডাম হেসে বললেন, ‘কে বলেছে? আজ হবে অন্য রকম একটি ক্লাস—মেঘলা দিনের ক্লাস।’

শিশুরা কৌতূহলী হয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।

ম্যাডাম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই মেঘগুলো কিন্তু শুধু বৃষ্টি নিয়ে আসে না। এরা নদী, সমুদ্র, পাহাড় আর বন পেরিয়ে অনেক দূর থেকে ভেসে আসে। প্রকৃতির প্রতিটি মেঘের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি করে গল্প।’

সবাই মন দিয়ে আকাশ দেখতে লাগল। কেউ মেঘের মধ্যে হাতির ছবি খুঁজে পেল, কেউ দেখল বিশাল পালতোলা নৌকা, কেউ আবার মনে করল সাদা তুলার তৈরি দুর্গ।

এরপর ম্যাডাম প্রত্যেককে একটি করে সাদা কাগজ দিলেন—‘তোমরা যে মেঘটি দেখছ, সেটি আঁকো। তারপর সেই মেঘকে নিয়ে ছোট্ট একটি গল্প লিখবে।’

মুহূর্তেই শ্রেণিকক্ষ ভরে উঠল রঙ, কল্পনা আর হাসিতে। কেউ নীল আকাশ আঁকল, কেউ রঙধনু, কেউ বৃষ্টিভেজা মাঠ। অনিক আঁকল একটি হাসিমুখ মেঘ, যে পৃথিবীর সব গাছে পানি পৌঁছে দেয়।

এমন সময় একটি ভেজা দোয়েল পাখি জানালার কার্নিশে এসে বসল। বৃষ্টিতে তার ডানাগুলো ভিজে গেছে। অনিক ধীরে ধীরে জানালাটি একটু খুলে দিল। নীলিমা ম্যাডাম একটি শুকনো কাপড় এনে পাশে রাখলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পাখিটি আবার ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল।

ম্যাডাম বললেন, ‘মনে রেখো, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখলে মনও সুন্দর হয়ে ওঠে। গাছ, পাখি, নদী আর মেঘ—সবাই আমাদের বন্ধু।’

ঠিক তখনই বৃষ্টি থেমে গেল। মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো বেরিয়ে এলো। আকাশের এক কোণে ফুটে উঠল রঙিন রঙধনু। শিশুরা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। যেন পুরো আকাশ তাদের জন্যই রঙে রঙে সেজে উঠেছে।

ছুটির আগে ম্যাডাম সবাইকে একটি বাক্য লিখতে বললেন—‘আজকের ক্লাস থেকে আমি কী শিখলাম?’

অনিক লিখল, ‘আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসব, গাছ লাগাব, পাখিদের যত্ন নেব এবং প্রতিটি মেঘের মধ্যে নতুন স্বপ্ন খুঁজে নেব।’

ম্যাডাম খাতা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি প্রতিটি খাতায় ছোট্ট একটি মেঘ এঁকে লিখে দিলেন—‘যে শিশু কল্পনা করতে জানে, তার শেখার আকাশ কখনো ছোট হয় না।’

বাড়ি ফেরার পথে অনিকের মনে হচ্ছিল, আজ সে শুধু একটি ক্লাস করেনি; সে শিখেছে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে, কল্পনাকে ডানা মেলতে দিতে এবং ছোট ছোট সৌন্দর্যের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে।

সেদিনের পর থেকে মেঘলা আকাশ দেখলেই অনিকের মনে পড়ে যায় সেই বিশেষ দিনের কথা। আর তাদের শ্রেণিকক্ষ সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে এক নতুন নামে—‘মেঘলা দিনের ক্লাসরুম’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন