ডেঙ্গুর ভয়াবহতার বছরে ৬শ মৃত্যু

আজাদুল আদনান

ডেঙ্গুর ভয়াবহতার বছরে ৬শ মৃত্যু

ডেঙ্গুতে ভয়াবহ একটি বছর পার করল বাংলাদেশ। গত এক বছরে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত লক্ষাধিক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬শ জনের। এডিস মশাবাহিত রোগে এই মৃত্যু দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

বিজ্ঞাপন

তবে মৃত্যুর এই সংখ্যা হাসপাতালভিত্তিক, ফলে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা কত সেই পরিসংখ্যান নেই সরকারের হাতে। এতো মৃত্যুর পরও সরকারের সংশ্লিষ্টদের মাঝে অনেকটা স্বস্তির ঢেকুর দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আড়াই শতক ধরে ডেঙ্গু মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। এই সময়ে ভাইরাসটির ধরন ও প্রতিরোধে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। কিন্তু মশা নির্মূল ও রোগী ব্যবস্থাপনায় অবহেলা রয়ে গেছে। ডেঙ্গু নির্মূল কার্যক্রমে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। মৃত্যু হলেও স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একে অপরকে ঠেলছে, কেউই দায় নিচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানোর তালিকায় বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ।

গত ২২ নভেম্বর হঠাৎ জ্বর আসে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাহর। শুরুতে সাধারণ ভাইরাস ভেবেছিল পরিবারের সদস্যরা। একদিন পর পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করালে মাত্র চারদিনের মাথায় মারা যায় শিশুটি।

রিফাহর বাবা রায়হানুল হক জানান, ‘শুরুতে সাধারণ ভাইরাস ভেবেছিলেন তারা। পরে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয় কিন্তু জ্বর কমে যায়, তবে মেয়ের প্রচণ্ড পেটব্যথা হচ্ছিল। চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির কথা বলেন। পরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে আইসিইউ না পাওয়ায় বেসরকারি একটি মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। ২৬ নভেম্বর সেখানেই তার মৃত্যু হয়।’

শুধু রিফাহ নয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫৭৫ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ শতাংশই পুরুষ। তবে মারা গেছেন বেশি নারী। মোট মৃত্যুর ৫১ শতাংশ নারী।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শূন্য থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশু রয়েছ ৭০ জন, যুবক ২২১ জন, মধ্যবয়স্ক ১৭৪ জন এবং মৃতদের মধ্যে বয়স্ক পাওয়া গেছে ১০৬ জন।

বিশালসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনে ১০ সদস্যের একটি ডেথ রিভিউ (মৃত্যু পর্যালোচনা) কমিটি গঠন করেছে সরকার। ইতোমধ্যে বেশকিছু মৃত্যুর পর্যালোচনা হয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি এই পর্যালোচনা শেষ হতে পারে।

পর্যালোচনা কমিটির একজন সদস্য আমার দেশকে জানিয়েছেন, আগের বছরের মতোই ২০২৪ সালেও যেসব মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তির মধ্যবর্তী সময় ছিল দুই থেকে তিনদিন। অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার একদিনের মাথায়।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আক্রান্ত হলেও শরীরে বড় কোনো লক্ষণ দেখা না গেলে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে চাননা রোগীরা। সুস্থ ভেবে স্বাভাবিক চলাফেরা করেন। ফলে হঠাৎ করেই প্রেশার একেবারে কমে যায়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ঠিকমতো কাজ করে না। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। ফলে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নিলেও বাঁচানো সম্ভব হয় না।’

মৃত্যুর কারণের সঙ্গে একমত হলেও ৬শ’ মানুষের মৃত্যুতেও যেন অনেকটা আত্মতৃপ্তি শোনা গেল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. হালিমুর রশিদের কণ্ঠে। আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের চেয়ে তিন ভাগের একভাগ রোগী এবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মৃত্যুও কমেছে। এ বছর বেশিরভাগ মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। কারণ, দেরিতে হাসপাতালে আসা।’

হালিমুর রশিদ বলেন, ‘গতবারের মতো এবারও ডেথ রিভিউ হচ্ছে। নতুন বছরের পরিকল্পনায় সিটি করপোরেশন, ইউনিসেফসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেক হোল্ডার নিয়ে বসা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জনসম্পৃক্ততায়। একই সঙ্গে চিকিৎসার গাইডলাইনেও পরিবর্তন আসছে। তবে প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মশা নির্মূল। এটি করা না গেলে যত ব্যবস্থাই নেওয়া হোক, মৃত্যু থামানো যাবে না।

এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার রোগী। এমতাবস্থায় এই সিটি করপোরেশনের মশা নির্মূল কার্যক্রম নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। তবে সমালোচনা অযৌক্তিক দাবি করে নিজেদের কার্যক্রমকে সফল দাবি করছেন ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির।

আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে যত রোগী পাওয়া গেছে তার ৮০ ভাগই ঢাকার বাইরের। আমরা ব্যর্থ হইনি, সফল হয়েছি। ফলে দক্ষিণ সিটিতে এবার রোগী ২০ ভাগে নেমেছে। আমরা মনে করি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। ঢাকার বড় বড় হাসপাতালগুলো এ সিটিতে হওয়ায় সারাদেশের তথ্য দক্ষিণের বলে চালিয়ে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ফজলে শামসুল কবির বলেন, ‘যে কীটনাশক আমরা ব্যবহার করি, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত। এগুলো জনস্বাস্থ্যসহ অন্য কিছুর ক্ষতি করে না। কার্যকারিতা যাচাই করেই আমরা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করি।’

তবে আগের বছরের তুলনায় গত বছর মৃত্যু তুলনামূলক কম হওয়ায় আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম সারোয়ার। আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। কারণ, মশার ঘনত্ব কোনো অংশে কমছে না। ভর্তির পাশাপাশি আক্রান্তের তথ্য পেলে পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হতো না। কারণ, সহজে পদক্ষেপ নেওয়া যেত।’

গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘বর্তমানে প্রচলিত কীটনাশকের কার্যকারিতা কতটা তা আমরা জানিনা, করণ নিয়মিত পরীক্ষা হচ্ছে না। আইইডিসিআরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থার ভেবে দেখা উচিত আগামী বছরও আমরা এগুলোই চালাব নাকি পরিবর্তন আনা যেতে পারে। মশা প্রতিরোধী হয়ে উঠছে কিনা সেটিও দেখা দরকার। কারণ, প্রকৃতি যেভাবে এবার আমাদের সহযোগিতা করেছে, নতুন বছরে তা নাও করতে পারে। এজন্য রোগী প্রথম যেখানে যায়, সেখান থেকেই তথ্য থাকতে হবে। এতে করে এলাকা থেকে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘প্রকৃতিতে মশার যেসব শত্রু আছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না করে বাঁচিয়ে রাখলে মশার প্রজনন হার স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। বর্তমানে কীটনাশক দেওয়ার ফলে মশা যতটা না মরছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সহায়ক শক্তি। ডেঙ্গু এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে গেছে। কাজেই স্বাস্থ্য ও পরিবার, স্থানীয় সরকার এবং কৃষি মন্ত্রণালয় জোরালো সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে।’

এদিকে দুই বছর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীর তথ্য ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরের জুনে সব ধরনের প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত চালু করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। নতুন বছরের মাঝামাঝি তা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের এক কর্মকর্তা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মোটামুটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেটি হয়নি। আশা করা যায় এ বছরেই দ্রুত হয়ে যাবে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন