প্রজাপতির বেড়ে ওঠা

নিদা বিনতে কবির

প্রজাপতির বেড়ে ওঠা

প্রজাপতি হলো লেপিডোপ্টেরা বর্গের একধরনের কীট। প্রজাপতির শরীর উজ্জ্বল রঙের এবং এরা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়। বেশিরভাগ প্রজাপতিই দিবাচর, মানে দিনের বেলা ঘুরে বেড়ায়। এ কারণে এরা সহজেই নজর কাড়ে।

প্রজাপতির মাথায় গোলাকার পুঞ্জাক্ষি বা গুচ্ছচোখ রয়েছে। এদের ১০ খণ্ডে গঠিত দেহ আকৃতিতে অনেকটা বেলুনের মতো, শেষের দু-তিনটি খণ্ড যৌনাঙ্গে পরিণত হয়েছে। প্রজাপতির জন্ম ডিম থেকেই হয়। তবে ডিম থেকে সরাসরি প্রজাপতি বের হয় না। প্রথমে শুঁয়োপোকা বের হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর সেই শুঁয়োপোকা প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হয়। আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগে উত্তর আমেরিকার আকাশে প্রজাপতি প্রথম উড়েছিল বলে জানা যায়। এরা পা দিয়ে ভেজা মাটি থেকে পানি শোষণ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

জীবনচক্র : প্রজাপতি সন্ধিপদী পর্বের অন্তর্ভুক্ত পতঙ্গ শ্রেণির প্রাণী। প্রজাপতি বিভিন্ন রকমের হয়। আমাদের দেশে যে ধরনের প্রজাপতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তাদের প্রজাতির নাম ‘পিলিয়ো ডেমোলিয়াস’ (Papilio demoleus)।

প্রজাপতির জীবনচক্র অন্যান্য পতঙ্গের মতো চারটি মাধ্যমের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়। মাধ্যমগুলি হলো—ডিম (Egg), লার্ভা (Larva), পিউপা (Pupa) এবং পূর্ণাঙ্গ (Imago)।

ডিম : স্ত্রী প্রজাপতি দিনের বেলায় গাছের পাতার নিচের তলে ডিম পাড়ে। আকন্দ, মুলো, সরষে ইত্যাদি গাছের পাতার তলপিঠে সাধারণত ডিম পাড়তে দেখা যায়।

স্ত্রী-প্রজাপতি একসময় প্রায় ৫০০ থেকে এক হাজারটি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো কাছাকাছি, কিন্তু আলাদা-আলাদাভাবে থাকে। ডিম দেখতে পোস্তদানার মতো গুঁড়াগুঁড়া। প্রতিটি ডিম এক মিলিমিটার লম্বা এবং প্রায় শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার চওড়া হয়। ডিমের রঙ প্রথমে হলুদ থাকে, পরে ধূসর হয়। ডিমের গায়ে লম্বা লম্বা রেখা ও আড়াআড়ি খাঁজ দেখা যায়।

লার্ভা : চার-পাঁচ দিন পর ডিম থেকে লার্ভা বেরিয়ে আসে। লার্ভা জন্মানোর পর সেই লার্ভাটি ডিমের খোলস খেয়ে ফেলে। প্রজাপতির লার্ভার গায়ে প্রচুর শুয়ো থাকে। তাই এদের শুঁয়োপোকা বা ক্যাটারপিলার (Caterpillar) বলা হয়। লার্ভা প্রচুর পরিমাণে পাতা খেয়ে ক্রমেই বড় হয়। পরিণত লার্ভা হওয়ার আগে মোট পাঁচবার খোলস ত্যাগ করে। খোলস ত্যাগের সময় এরা অভুক্ত থাকে। পরিণত লার্ভা লম্বায় প্রায় ৪৫ মিলিমিটারের মতো হয়। প্রজাপতির লার্ভার দেহে ১৪টি দেহখণ্ডক থাকে। প্রথম দেহখণ্ডক নিয়ে মাথা, পরের তিনটি দেহখণ্ডক নিয়ে বুক ও শেষ ১০টি দেহখণ্ডক নিয়ে উদর গঠিত হয়। বুকে তিন জোড়া পা থাকে। সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম ও শেষ দেহখণ্ডের প্রতিটিতে একজোড়া করে উপপদ বা চোষকপদ (Prolegs or Sucker-legs) দেখা যায়। শেষ জোড়া উপপদগুলো বেশ বড় ও শক্তিশালী। একে ক্লাসপার (Clasper) বলা হয়। দ্বিতীয় ও পঞ্চম থেকে দ্বাদশ দেহখণ্ডকের প্রতিটির দুপাশে ছোট ছোট শ্বাসছিদ্র (Spiracles) দেখা যায়। উপযুক্ত পরিবেশে ঠিকমতো খাবার পেলে লার্ভা পরিণত হতে প্রায় ১৬ দিন সময় লাগে।

পিউপা : শেষ খোলস ত্যাগের পর লার্ভা পিউপায় রূপান্তরিত হয়। এই অবস্থায় এরা খাবার খায় না। এরা মুখ থেকে একরকম লালা বের করে। এই লালা শুকিয়ে গেলে রেশমি দড়ি বা ক্রিম্যাস্টার (Cremaster) গঠিত হয়। এটির সাহায্যে প্রাণীটি পিছন দিক আটকে ঝুলতে থাকে। তারপর কয়েক দিনের মধ্যে দেহের চারপাশে একটি অর্ধস্বচ্ছ আবরণ তৈরি করে। এই আবরণকে বলা হয় পিউপেরিয়াম (Puparium)। পিউপেরিয়ামের ভেতরের প্রাণীটির নামই পিউপা (Pupa)। এরা পিউপা অবস্থায় প্রায় সাত দিন থাকে।

পিউপা দেখতে সামান্য লম্বা, দুপ্রান্ত সরু ও মাঝখানে মোটা। লার্ভার তুলনায় পিউপা আকারে অনেক ছোট হয়। পিউপার রং প্রথমে হলুদ ও পরে ধূসর হয়। প্রজাপতির পিউপাকে ক্রিসালিস (Chrysalis) বলে। পিউপা রূপান্তরিত হয়ে প্রজাপতিতে পরিণত হয়। পরিণত প্রজাপতি পিউপেরিয়াম ভেদ করে বাইরে আসে। এরা উড়তে পারে।

প্রজাপতির বৈশিষ্ট্য : প্রজাপতির দেহ মাথা, বুক ও উদর নিয়ে গঠিত। মাথায় একজোড়া পুঞ্জাক্ষি (Compound Eye) ও শুঙ্গ (Antenna) থাকে। মুখের উপাঙ্গ নলাকার। একে শুঁড় (Proboscis) বলে। বুকে তিন জোড়া পা এবং এক জোড়া ডানা থাকে। ডানার রঙ চিত্রবিচিত্র ও খুবই আকর্ষণীয়। ডানায় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আঁশ থাকে। এগুলো বিভিন্ন রঙের হয় বলেই ডানায় এত রঙের বৈচিত্র্য দেখা যায়।

প্রজাপতি শুধু বংশবিস্তারই ঘটায় না, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও সাহায্য করে। প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সৌরশক্তি ধারণ করতে সক্ষম প্রজাপতির পাখা; যে সৌরশক্তি থেকে উচ্চতর ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রজাপতির পর্যাপ্ত চাহিদা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতি বছর ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রজাপতি কেনাবেচা চলে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন প্রজাপতি রপ্তানি করে প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রজাপতি উৎপাদন করে রপ্তানি করার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন