হেবা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের দাবি, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের নতুন বিধানের মাধ্যমে হেবা সম্পন্ন না করেও হেবার প্রায় সব কার্যকারিতা প্রয়োগের একটি পৃথক সম্পত্তি হস্তান্তরব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান যশোরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, আইনটি না পড়ে এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। হেবা আইনে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা কারও নেই। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হেবা বা অন্য কোনো ধর্মীয় আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এ আইন কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।
তবে আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেন, নতুন আইনের মাধ্যমে হেবার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেও দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখল ধরে রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে হেবা না হওয়া সত্ত্বেও দাতার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তি উত্তরাধিকারীরা দাবি করতে পারবেন না—এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স মনে করে, নতুন আইনে এমন একটি পৃথক সম্পত্তি হস্তান্তরব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে দাতা সম্পত্তি দান করার পরও নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। সংগঠনটির মতে, মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে এ ধরনের ব্যবস্থাকে বৈধ হেবা হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
ওলামা অ্যালায়েন্সের নেতৃবৃন্দ বলেন, মুসলিম আইনে হেবার বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো কবজা বা দখল হস্তান্তর। দাতা হেবা সম্পন্ন করার পর গ্রহীতাকে সম্পত্তির ওপর কার্যকর দখল ও নিয়ন্ত্রণ দিতে হয়।
কিন্তু প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় দাতা যদি নিজের জন্য আজীবন ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করেন এবং গ্রহীতা কার্যকরভাবে সম্পত্তির দখল ও মালিকানা প্রয়োগ করতে না পারেন, তাহলে সেটিকে হেবা হিসেবে অভিহিত করা যায় না বলে দাবি সংগঠনটির।
তাদের মতে, এই আইন মেনে কেউ নিজ সম্পত্তি দান করলে মুসলিম পরিবারব্যবস্থা ও উত্তরাধিকার নীতিতে ওই সম্পদের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের দাবি, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী হেবা বৈধভাবে সম্পন্ন না হলে সম্পত্তির মালিকানা দাতার কাছেই থাকবে এবং তাঁর মৃত্যুর পর তা উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তির অংশ হবে।
কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের অধীনে নতুন এই ব্যবস্থার ফলে মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা তাঁদের নির্ধারিত অংশ দাবি করতে পারবেন না—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংগঠনটি মনে করছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২এ(১) উপধারার কথা উল্লেখ করেছে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স। উপধারাটিতে বলা হয়েছে, “Notwithstanding anything contained in any other law for the time being in force”—অর্থাৎ বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, নতুন বিধানের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের নেতৃবৃন্দ বলেন, হেবা আইনকে সরাসরি বাতিল না করলেও এমন একটি বিকল্প ব্যবস্থা সরকার নিয়েছে, যা বাস্তবে হেবার শর্তকে পাশ কাটিয়ে মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তারা এ বিষয়ে সরকারের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং বিজ্ঞ মুফতিদের পরামর্শের ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধনের আহ্বান জানান।
সংগঠনটির দাবি, এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধন করা না হলে নতুন এই আইন কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


