প্রতিবছর ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপী বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Hepatitis : Let’s break it down’ (হেপাটাইটিস : আসুন, বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই)। এই প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো—স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রতিটি মানুষের জন্য হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
হেপাটাইটিস হলো লিভারের (যকৃতের) প্রদাহজনিত রোগ। এটি প্রধানত ভাইরাসের সংক্রমণে হলেও অতিরিক্ত মদ্যপান, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষাক্ত রাসায়নিক ও অটোইমিউন রোগের কারণেও হতে পারে। ভাইরাল হেপাটাইটিসের মধ্যে হেপাটাইটিস বি (HBV) ও হেপাটাইটিস সি (HCV) সবচেয়ে বেশি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি করে।
বিশ্ব পরিস্থিতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী—বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি এবং ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস সি নিয়ে বসবাস করছেন।
প্রতিবছর প্রায় ১৮ লাখ মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বি ও সি’তে আক্রান্ত হন। প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারসহ হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় মারা যান। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এখনো রোগ সম্পর্কে জানেন না বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেননি।
হেপাটাইটিসের প্রকারভেদ
* হেপাটাইটিস A : দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া যায়।
* হেপাটাইটিস B : সংক্রমিত রক্ত, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং মা থেকে শিশুর মধ্যে ছড়ায়। দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
* হেপাটাইটিস C : প্রধানত সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। আধুনিক ওষুধে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন।
* হেপাটাইটিস D : শুধু হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তিদের হয় এবং রোগের জটিলতা বাড়ায়।
* হেপাটাইটিস E : দূষিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে ছড়ায়। গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।
সংক্রমণের প্রধান কারণ
* সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ
* জীবাণুমুক্ত না করা সুচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার
* অনিরাপদ অস্ত্রোপচার, দাঁতের চিকিৎসা বা ট্যাটু
* অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক
* সংক্রমিত মা থেকে নবজাতকের মধ্যে সংক্রমণ
* রেজার, নখ কাটার যন্ত্র বা টুথব্রাশ ভাগাভাগি করে ব্যবহার
কারা বেশি ঝুঁকিতে
* শিশু : জন্মের সময় সংক্রমিত মায়ের কাছ থেকে হেপাটাইটিস বি হতে পারে। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দিলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
* গর্ভবতী নারী : হেপাটাইটিস বি ও ই মা এবং নবজাতক—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
* পুরুষ : লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের হার পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি।
নিরাপত্তাহীন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী, বারবার রক্ত গ্রহণকারী এবং স্বাস্থ্যকর্মীরাও ঝুঁকিতে থাকেন।
লক্ষণ
অনেকেরই শুরুতে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে দেখা দিতে পারে—
* অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি
* জ্বর
* ক্ষুধামান্দ্য
* বমি বমি ভাব বা বমি
* পেটের ডান পাশে ব্যথা
* গাঢ় রঙের প্রস্রাব
* চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
* শরীর চুলকানো
* ফ্যাকাশে রঙের মল
জটিলতা
চিকিৎসা না করলে দীর্ঘ মেয়াদে হতে পারে—
* লিভার সিরোসিস
* লিভার বিকল
* লিভার ক্যানসার
* পেটে পানি জমা
* খাদ্যনালির রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ
* মৃত্যু
রোগ নির্ণয়
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হতে পারে—
* HBsAg
* Anti-HCV
* HBV DNA বা HCV RNA
* Liver Function Test (LFT)
* আলট্রাসোনোগ্রাম
* প্রয়োজন হলে FibroScan
প্রতিরোধের উপায়
* জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া
* শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা
* নিরাপদ ও পরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ করা
* জীবাণুমুক্ত সুচ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করা
* নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করা
* ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র ভাগাভাগি না করা
* বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করা
ঘরোয়া পরামর্শ
* পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
* প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করুন
* সুষম ও সহজপাচ্য খাবার খান
* অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন
* ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ বর্জন করুন
* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ভেষজ ওষুধ গ্রহণ করবেন না
* নিয়মিত ফলোআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান
* পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন অনুযায়ী হেপাটাইটিস বি টিকা নিশ্চিত করুন
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

