আমরা অনেক সময় রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করি আর ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে হয়তো ভাবতে থাকি—আদৌ কি ঘুম আসবে? কখন ঘুম আসবে? অথবা অনেক সময় মাঝরাতে হুট করে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আর ঘুমাতে পারি না। তাই না? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আমাদের প্রয়োজন ‘স্লিপ হাইজিন’ (Sleep Hygiene) বা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি উন্নত করা।
স্লিপ হাইজিন কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, স্লিপ হাইজিন হলো সুস্থ ঘুমের (Sound Sleep) জন্য প্রয়োজনীয় কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা সরাসরি ঘুমের ওপর নির্ভর করে। দিনের বেলা আমরা কী খাচ্ছি, কতটা কাজ করছি বা ঘুমানোর ঠিক আগে আমাদের পরিবেশ কেমন—এই সবকিছুর সমষ্টিই হলো স্লিপ হাইজিন। আজ আমরা জানব, ভালো ও সুস্থ ঘুমের জন্য বিশেষজ্ঞদের অনুমোদিত ১২টি কার্যকর কৌশল।
১. ঘড়ির কাঁটায় নিয়ম মানুন
আমাদের শরীরের ভেতরে একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’। এটি বজায় রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। ছুটির দিনেও এর ব্যতিক্রম করা যাবে না। এতে আপনার শরীর একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এবং সময়মতো অটোমেটিক আপনার চোখে ঘুম নেমে আসবে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম অপরিহার্য।
২. ঘুমের আগে চাই প্রশান্তি
ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে একটি রুটিন তৈরি করুন, যা আপনার শরীরকে বার্তা দেবে যে এখন বিশ্রামের সময়। হালকা গরম পানিতে গোসল, পেশির জড়তা কাটাতে সামান্য স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম বা Yoga এবং প্রশান্তিদায়ক গান, কোরআন তিলাওয়াত শোনা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। এই অভ্যাসগুলো শরীরের টানটান ভাব কমিয়ে আমাদের মনকে শান্ত করে।
৩. নীল আলোর স্ক্রিনকে বলুন ‘না’
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) আমাদের শরীরের ‘মেলাটোনিন’ হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। এই হরমোনটিই আমাদের ঘুমের জন্য দায়ী। তাই ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখুন। আমাদের ব্যবহৃত ডিভাইস বা ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. নিয়মিত শরীরচর্চা
দিনের বেলা অন্তত ৩০ মিনিটের শারীরিক পরিশ্রম বা অ্যারোবিক ব্যায়াম রাতের ঘুমের মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সূর্যের আলোয় ব্যায়াম করলে আরো ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে মনে রাখবেন, ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তে ভারী ব্যায়াম করবেন না। এটি শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ঘুমানোর ক্ষেত্রে উল্টো ফল দিতে পারে।
৫. ক্যাফেইন ব্যবহারে সতর্কতা
চা, কফি বা চকোলেটে থাকা ক্যাফেইন আমাদের মস্তিষ্কে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। দুপুরের পর তাই ক্যাফেইনজাতীয় পানীয় পরিহার করাই ভালো। আপনার বিকালের কফিটিই হতে পারে আপনার রাতের অনিদ্রার মূল কারণ।
৬. উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা
Sound Sleep বা সুন্দর ঘুমের জন্য অন্ধকার, শান্ত এবং শীতল পরিবেশ সবচেয়ে ভালো। ঘুমানোর সময় রুমের তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা আদর্শ। আরামদায়ক ম্যাট্রেস ও বালিশ ব্যবহার করলে ঘুম হয় আরামদায়ক। যদি চারপাশের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তবে ‘হোয়াইট নয়েজ’ বা এয়ারপ্লাগ ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের জানালাগুলোয় ভারী পর্দা ব্যবহার করুন, যাতে বাইরের আলো ভেতরে না আসে।
৭. বিছানাকে শুধু ঘুমের জন্য রাখুন
আমাদের মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যে বিছানা মানেই ঘুম। বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করা, খাবার খাওয়া বা গেম খেলা থেকে বিরত থাকুন। এতে করে আপনি যখনই বিছানায় যাবেন, মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হবে।
৮. জোর করে ঘুমের চেষ্টা
শুয়ে থাকার ২০ মিনিটের মধ্যেও যদি ঘুম না আসে, তবে বিছানায় শুয়ে ছটফট করবেন না। বিছানা থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করুন। মৃদু আলোতে বই পড়ুন বা শান্ত কিছু করুন। যখন ক্লান্তি অনুভব করবেন, তখনই আবার ঘুমানোর জন্য বিছানায় আসবেন।
৯. দিনের বেলার ঘুম সীমিত করুন
দুপুরে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতের স্বাভাবিক ঘুম বিঘ্নিত হয়। যদি খুব প্রয়োজন হয়, তবে দুপুর বা বিকালের দিকে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট বিশ্রাম নিতে পারেন। তবে বেলা ৩টার পর না ঘুমানোই ভালো।
১০. মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকা
সারা দিনের দুশ্চিন্তা নিয়ে বিছানায় গেলে ঘুম আসা কঠিন। দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো ডায়েরিতে লিখে রাখুন। গবেষকদের মতে, ‘টু-ডু লিস্ট’ বা আগামীকালের কাজের তালিকা লিখে রাখলে মনের ওপর চাপ কমে। এছাড়া গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা মেডিটেশন মানসিক স্থিরতা আনে।
১১. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
রাতে খুব বেশি মসলাযুক্ত বা ভারী খাবার না খাওয়া উচিত। এটি বুকে জ্বালাপোড়া বা বদহজম ঘটিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমানোর অন্তত দু-তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিত। এছাড়া ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে, কারণ এগুলো ঘুমের গভীরতা কমিয়ে দেয়।
১২. প্রাকৃতিকভাবে আলোর নিয়ন্ত্রণ
দিনের বেলা পর্যাপ্ত সূর্যের আলোয় সময় কাটান। এটি আপনার শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লককে সচল রাখে। আবার সন্ধ্যার পর থেকেই ঘরের আলো মৃদু করে দিন। বাড়িতে ওয়ার্ম লাইট বা হলুদ আলো ব্যবহার করা ভালো, যা শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করে।
তথ্যসূত্র : হেলথ লাইন অবলম্বনে
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

