আলসার বলতে ক্ষত বোঝায়। আলসার, যা পাকস্থলীর অভ্যন্তরীণ আস্তরণে এবং ছোট অন্ত্রের উপরের অংশে বিকশিত হয়, তাকে পেপটিক আলসার বলে। সাধারণত একটি পুরু শ্লেষ্মা স্তর পাকস্থলীর পাচন রসের প্রভাব থেকে পাকস্থলীর আস্তরণকে রক্ষা করে। অনেক কিছু এই প্রতিরক্ষামূলক স্তর কমাতে পারে এবং পাকস্থলীর অ্যাসিড দ্বারা টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে।
ধরন
• গ্যাস্ট্রিক আলসার : এই আলসার পাকস্থলীর অভ্যন্তরে হয়, যেটি আলসার অব স্টোমাক বা পাকস্থলীর ক্ষত।
• ইসোফেজিয়াল আলসার : এই আলসার খাদ্যনালির ভেতরে তৈরি হয়।
• ডুওডেনাল আলসার : এই আলসার ছোট অন্ত্রের উপরের অংশে তৈরি হয়।
কারণ : প্রধানত দুটি কারণে হতে পারে। প্রথমত, হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামক একটি ব্যাকটেরিয়া আছে। এর সংক্রমণ থেকে হতে পারে। এটিই মূল কারণ। দ্বিতীয়ত, পেপসিন ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের বিক্রিয়ার কারণে পেপটিক আলসার হয়। তৃতীয়ত, ব্যথানাশক ওষুধ। অ্যাসপিরিন বা নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস খাওয়ার ফলে হতে পারে।
ঝুঁকি : ক্যানসার ও অন্যান্য ডুওডেনাল আলসার থেকে সাধারণত ক্যানসার হয় না। কিন্তু গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার হতে পারে। কিছু উপসর্গ আছে, যা অ্যালার্ম ফিচার হিসেবে বিবেচিত হয়; যেমন পরিবারে পাকস্থলীর ক্যানসারের ইতিহাস থাকা, অনবরত বমি হওয়া, খাবার খেতে ও ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া, পেটে চাকা অনুভূত হওয়া, কিংবা ওজন কমে যাওয়া।
পরীক্ষা
• ইমেজিং : এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যান আলসার শনাক্ত করে।
• এন্ডোস্কোপি : সময়োপযোগী পরীক্ষা এন্ডোস্কোপি।
• রক্ত পরীক্ষায় শনাক্ত হয়।
• এইচ পাইলোরি পরীক্ষা।
পেপটিক আলসারের লক্ষণ
পাকস্থলীতে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়, তার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের দরুন বেড়ে যেতে পারে। পাকস্থলীর আলসারের সবচেয়ে কমন লক্ষণ হলো বিশেষ ধরনের ব্যথা। আলসারে পেটের মাঝ বরাবর জ্বালাপোড়া করতে থাকে। তবে সবার ক্ষেত্রেই যে ব্যথা থাকে, তা নয়। কারো কারো ক্ষেত্রে অন্যান্য লক্ষণও থাকতে পারে; যেমন পেটের উপরিভাগে ব্যথা। পেটে হঠাৎ তীব্র ও তীক্ষ্ণ ব্যথা, বমি-বমি ভাব, বমি হওয়া, রক্তবমি, ক্ষুধামান্দ্য ও বদহজম হতে পারে। পেপটিক আলসারের কারণে অনেক সময় রক্তক্ষরণ হয়ে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া কালো আঠালো আলকাতরার মতো মলত্যাগ, কালো বা টারি মল, মলে রক্ত, বুক ও পেটে জ্বালাপোড়া, অম্বল বা পেট ভরে থাকার অনুভূতি, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, ওজন কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
জীবনযাপনে পরিবর্তন : পেপটিক আলসার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে হয়। এই ব্যাকটেরিয়া অস্বাস্থ্যকর খাবার ও দূষিত পানিতে ছড়ায়, এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেশি হয়। জীবনাচারে পরিবর্তন এবং প্রতিরোধে নিয়ম মেনে চলতে হবে।
১. স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খেতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে এবং ফরমালিনমুক্ত শাকসবজি খেতে হবে।
২. অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার, জাঙ্ক ফুড, কফি ও চকলেট খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
৩. অ্যালকোহল ও ধূমপান থেকেও হতে পারে তাই এগুলা পরিহার করতে হবে।
৪. নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করতে হবে।
৫. প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
হোমিও চিকিৎসা : আলসার নিরাময়ে রোগীর শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ, হজম এবং জীবনযাত্রার ভিত্তিতে ওষুধ নির্বাচন করা হয়। হোমিওপ্যাথিতে রোগীর সামগ্রিক উপসর্গের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করালে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের প্রয়োগ অত্যন্ত কার্যকর। পেপটিক আলসারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা কয়েকটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ, যথা—নাক্স ভমিকা, পালসেটিলা, কার্ব ভেজ, চায়না, বেলেডোনা, এবিস নাইগ্রা, লাইকোপোডিয়াম, নেট্রাম সালফ, আর্জেন্ট নাইট্রিকাম, আর্সেনিক, ক্যালি বাইক্রম, ইপিকাক ও হাইড্রাসটিস উল্লেখযোগ্য। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিরাপদ, প্রাকৃতিক ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত।
লেখক : হোমিও চিকিৎসক, তুলি হোমিওপ্যাথি, মাজার রোড, মিরপুর, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

