একজন মানুষ প্রতিদিন প্রায় এক লাখবার হৃৎস্পন্দনের মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করেন। এই নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞের পেছনে নিরলসভাবে কাজ করে হৃদযন্ত্রের চারটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভালভ। এগুলো রক্তকে একমুখী প্রবাহ নিশ্চিত করে এবং রক্তকে উল্টোদিকে ফিরে যেতে বাধা দেয়। কিন্তু যখন এই ভালভগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, শক্ত হয়ে যায় কিংবা ঠিকমতো বন্ধ হতে পারে না, তখন শুরু হয় হৃদযন্ত্রের ভালভের রোগ (Valvular Heart Disease)। অনেকেই মনে করেন, হৃদরোগ মানেই হার্ট অ্যাটাক। বাস্তবে হৃদযন্ত্রের ভালভের রোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে দেয় এবং চিকিৎসা না করলে হার্ট ফেইলিউর, স্ট্রোক এমনকি আকস্মিক মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
দেশে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রোগ?
উন্নত দেশগুলোতে বয়সজনিত কারণে ভালভের রোগ বেশি দেখা গেলেও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এখনো রিউম্যাটিক জ্বর অন্যতম প্রধান কারণ। শৈশবে গলার ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের যথাযথ চিকিৎসা না হলে পরে রিউম্যাটিক জ্বর হয় এবং বহু বছর পরে হৃদযন্ত্রের ভালভ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া জন্মগত ত্রুটি, বয়সজনিত ক্যালসিয়াম জমা, হৃদযন্ত্রের সংক্রমণ (ইনফেকটিভ এন্ডোকার্ডাইটিস), উচ্চ রক্তচাপ এবং কিছু বিরল রোগও ভালভের সমস্যার জন্য দায়ী।
কোন ভালভ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়
হৃদযন্ত্রের চারটি ভালভের মধ্যে মাইট্রাল ভালভ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে মাইট্রাল ও অ্যাওর্টিকÑদুটি ভালভই একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একজন রোগীর সমস্যা শুধু একটি ভালভে সীমাবদ্ধ থাকবেÑএমনটি সব সময় নয়।
মাইট্রাল স্টেনোসিস
মাইট্রাল ভালভ সংকুচিত হয়ে গেলে বাম অলিন্দ থেকে বাম নিলয়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে রক্ত ফুসফুসে জমতে শুরু করে এবং রোগী প্রথমে হাঁটাচলা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। ক্রমে দেখা দিতে পারেÑ
অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া
✔️ রাতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
✔️শুকনো বা রক্তমিশ্রিত কাশি
✔️বুক ধড়ফড় করা
✔️কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া
✔️পা ফুলে যাওয়া
চিকিৎসা না হলে হৃৎস্পন্দনের অনিয়ম, স্ট্রোক এবং হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
মাইট্রাল রিগারজিটেশন
এই অবস্থায় ভালভ পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে না। ফলে প্রতিবার হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে কিছু রক্ত আবার পেছনের দিকে ফিরে যায়। শুরুতে রোগী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকতে পারেন। কিন্তু ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র বড় হয়ে যায় এবং তার কর্মক্ষমতা কমে আসে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ
✔️ দীর্ঘদিনের ক্লান্তি
✔️ শ্বাসকষ্ট
✔️বুক ধড়ফড় করা
✔️ রাতে শোয়ার পর শ্বাস নিতে কষ্ট
✔️ গুরুতর অবস্থায় ফুসফুসে পানি জমা
অ্যাওর্টিক স্টেনোসিস
অবহেলা করলে হঠাৎ মৃত্যুও হতে পারে। অ্যাওর্টিক ভালভ সরু হয়ে গেলে শরীরে রক্ত পাঠাতে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এই রোগের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হলোÑ
✔️বুকে ব্যথা
✔️অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা মাথা ঘোরা
✔️ শ্বাসকষ্ট
বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এই উপসর্গগুলো দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা ছাড়া দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা কঠিন। তাই সময়মতো রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরি।
অ্যাওর্টিক রিগারজিটেশন
অ্যাওর্টিক ভালভ ঠিকমতো বন্ধ না হলে শরীরে পাঠানো রক্তের একটি অংশ আবার হৃদযন্ত্রে ফিরে আসে। এতে দীর্ঘদিন ধরে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। রোগীরা সাধারণত অনুভব করেনÑ
✔️ বুক ধড়ফড় করা
✔️বুকে চাপ বা ব্যথা
✔️ শ্বাসকষ্ট
✔️ ঘাড় বা কব্জির নাড়ি অস্বাভাবিক জোরে অনুভূত হওয়া
লক্ষণ
নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ থাকলে অবশ্যই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিনÑ
✔️ অল্প হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট
✔️ দীর্ঘদিন বুক ধড়ফড় করা
✔️ বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা
✔️ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
✔️ পা ফুলে যাওয়া
✔️ দীর্ঘদিন জ্বরের পর হৃদযন্ত্রে নতুন মারমার শব্দ ধরা পড়া
কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়?
বর্তমানে ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Echo) হচ্ছে ভালভের রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ পরীক্ষা। এছাড়া প্রয়োজনে ইসিজি, বুকের এক্স-রে, সিটি বা এমআরআই এবং কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশনও করা হতে পারে।
চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন
একসময় ভালভের রোগ মানেই ছিল বড় অপারেশন। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে বুক না কেটেই ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে বেলুন ভালভুলোপ্লাস্টি করা সম্ভব। প্রয়োজন হলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ভালভ মেরামত (Valve Repair) অথবা কৃত্রিম বা টিস্যু ভালভ প্রতিস্থাপন (Valve Replacement) করা হয়।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগীই স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে যেতে পারেন।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
হৃদযন্ত্রের ভালভের অনেক রোগই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
✔️শিশুদের গলাব্যথা বা টনসিলের সংক্রমণকে অবহেলা করবেন না।
✔️ রিউম্যাটিক জ্বরের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিশ্চিত করুন।
✔️ যাদের আগে রিউম্যাটিক জ্বর হয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ওষুধ বা ইনজেকশন গ্রহণ করুন।
✔️ ধূমপান বর্জন করুন।
✔️উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
✔️ নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাদ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
✔️ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে ইকোকার্ডিওগ্রাফি করুন।
সচেতনতাই পারে জীবন বাঁচাতে
হৃদযন্ত্রের ভালভের রোগ অনেক সময় বছরের পর বছর নীরবে অগ্রসর হয়। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে সেটি অনেক ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রসর পর্যায়ের ইঙ্গিত দেয়। তাই শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে আজ অধিকাংশ ভালভের রোগ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্থায়ীভাবে সংশোধন করা সম্ভব। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ হৃদযন্ত্র ও দীর্ঘায়ুর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ
শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

