আগুনে পোড়া রোগীর কষ্ট কেবল চামড়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ব্যক্তির মানসিকতা, সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের মৌলিক ক্ষমতাকেও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মুখমণ্ডল, গলা বা শ্বাসতন্ত্রের অঙ্গগুলো আক্রান্ত হলে রোগীর কথা বলা, খাদ্য গ্রহণ করা এবং দৈনন্দিন যোগাযোগ রক্ষা করা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই জটিল পরিস্থিতিতে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসার ভূমিকা জীবনরক্ষাকারী পর্যায়ের। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিশেষজ্ঞ পোড়া রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বাসন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেন। গলা বা স্বরযন্ত্রের ক্ষতি হলে কণ্ঠস্বর দুর্বল বা বিকৃত হয়ে যায়। বিশেষায়িত ব্যায়াম ও কৌশলের মাধ্যমে স্বর স্বাভাবিক করতে তারা সহায়তা করেন। মুখের পেশি, ঠোঁট, জিহ্বা বা চোয়ালের ক্ষতি ঘটলে শব্দ উচ্চারণে সমস্যা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী, মুখমণ্ডল পোড়া রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সমস্যার সম্মুখীন হন। থেরাপিউটিক ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে এসব অঙ্গের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধারে প্র্যাকটিস করা হয়।
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলো গলাধঃকরণের সমস্যা। মুখ বা গলার পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাবার চিবাতে ও গিলতে অসুবিধা হওয়ার পাশাপাশি শ্বাসনালিতে খাদ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। বৈশ্বিক গবেষণা থেকে জানা যায়, মুখমণ্ডল পোড়া রোগীদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা উদ্বেগজনক হারে দেখা দেয়। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিশেষজ্ঞ নিরাপদ গলাধঃকরণ কৌশল শেখানো, খাদ্যের গঠন পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া এবং খাদ্য গ্রহণকালে বিপদ কমানোর মাধ্যমে জীবনরক্ষায় ভূমিকা রাখেন। সাময়িক বা স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় কথা বলতে অক্ষম রোগীদের ছবির কার্ড, যোগাযোগ বোর্ড বা ইলেকট্রনিক আসেস্টিভ ডিভাইসের ব্যবহার শিখিয়ে তাদের সামাজিক যোগাযোগ সচল রাখার চেষ্টাও করা হয়।
স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পোড়া রোগীর পূর্ণ পুনর্বাসনের জন্য বহু বিভাগীয় চিকিৎসক দল অপরিহার্য। এই দলে চিকিৎসক এবং বার্ন বা প্লাস্টিক সার্জন প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের দায়িত্বে থাকেন। ফিজিওথেরাপিস্ট শরীরের চলাচল ও পেশির সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেন। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট দৈনন্দিন কাজকর্মে স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। আর স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিশেষজ্ঞ কথা বলা, গলাধঃকরণ ও সংশ্লিষ্ট শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা সমাধানে নিরলসভাবে থেরাপিউটিক চিকিৎসা প্রদান করেন। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই কেবল রোগীর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে পারে।
আগুন শুধু দেহ নয়, তা পুড়িয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন ও ব্যক্তির সামাজিক পরিচয়। কথা বলার ক্ষমতা, স্বাভাবিকভাবে খাবার খাওয়া এবং অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করার মতো মৌলিক দক্ষতাগুলো পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একজন পোড়া রোগীর আত্মমর্যাদা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি করেন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিশেষজ্ঞরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমাদের জরুরি অনুরোধ—দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসাসেবা আবশ্যিকভাবে চালু করা হোক। পাশাপাশি রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন অনুযায়ী স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে এই জীবনরক্ষাকারী পুনর্বাসন স্বাস্থ্যসেবা যেন সব স্তরের মানুষ সহজে ও বিনা মূল্যে পেতে পারে, এটি নিশ্চিত করা উচিত। পোড়া রোগীদের পূর্ণ মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
লেখক : কনসালটেন্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি
বিভাগীয় প্রধান, সিআরপি, সাভার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

