অর্থোপেডিকের ঝুঁকি বাড়ায়

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস

ডা. শেখ সাদিউল ইসলাম

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিসের কথা উঠলেই আমরা সাধারণত কিডনি, চোখ, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকির কথা ভাবি। কিন্তু অনেকেই জানেন না, ডায়াবেটিস শরীরের হাড়, জয়েন্ট, পেশি, টেনডন ও লিগামেন্টকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শরীরে কোলাজেন নামক প্রোটিনের গঠন পরিবর্তিত হয়। এর ফলে টেনডন ও লিগামেন্ট শক্ত এবং অনমনীয় হয়ে যায়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র রক্তনালি ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রক্ত চলাচল কমে যায়, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। এসব পরিবর্তনের সম্মিলিত ফলেই একের পর এক অর্থোপেডিক সমস্যা দেখা দেয় বা বিদ্যমান রোগ আরো জটিল হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি এবং আরো কয়েক কোটি মানুষ প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছেন। তাই ডায়াবেটিসজনিত অর্থোপেডিক জটিলতা সম্পর্কে সচেতনতা এখন সময়ের দাবি।

বিজ্ঞাপন

ডায়াবেটিসে যেসব অর্থোপেডিক রোগ বেশি দেখা যায়

১. কাঁধের ব্যথা : ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা হলো ফ্রোজেন শোল্ডার। কাঁধে ব্যথা, হাত ওপরে তুলতে অসুবিধা, জামা পরা বা চুল আঁচড়াতে কষ্ট—এসবই এর লক্ষণ। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।

২. আঙুল আটকে যাওয়া : আঙুল বাঁকানোর পর সোজা করতে গেলে আটকে যায় বা ‘ক্লিক’ শব্দ হয়। অনেক সময় আঙুল একেবারে লক হয়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিসে টেনডনের চারপাশ মোটা হয়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।

৩. হাত ঝিনঝিন করা : হাতে ঝিনঝিনি, অবশ ভাব, বিশেষ করে রাতে ব্যথা বেড়ে যাওয়া। এসব লক্ষণ কার্পাল টানেল সিনড্রোমের। ডায়াবেটিসে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ায় এ সমস্যা বেশি হয়।

৪. হাত শক্ত হয়ে যাওয়া : হাতের চামড়া শক্ত ও মোমের মতো হয়ে যায়, আঙুল পুরোপুরি ভাঁজ বা সোজা করা যায় না। দুই হাত জোড়া করে ‘প্রেয়ার সাইন’ করতে কষ্ট হয়। এটি দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

৫. হাতের তালুর টিস্যু শক্ত হয়ে আঙুল বাঁকা হয়ে যাওয়া : হাতের তালুর নিচে শক্ত গুটি তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে আঙুল স্থায়ীভাবে বাঁকা হয়ে যায়।

৬. জয়েন্ট : এটি ডায়াবেটিসের সবচেয়ে ভয়ংকর অর্থোপেডিক জটিলতাগুলোর একটি। স্নায়ুর অনুভূতি কমে যাওয়ায় রোগী ব্যথা না পেলেও পায়ের হাড় ও জয়েন্ট ধীরে ধীরে ভেঙে বিকৃত হয়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে পায়ে ঘা, সংক্রমণ, এমনকি অঙ্গচ্ছেদের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

৭. ডায়াবেটিক ফুট আলসার ও সংক্রমণ : সামান্য কাটা বা ফোসকাও বড় ঘায়ে পরিণত হতে পারে। রক্ত চলাচল কমে যাওয়া এবং স্নায়ুর ক্ষতির কারণে ক্ষত শুকাতে দেরি হয় এবং সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার বা অঙ্গচ্ছেদ পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে।

৮. অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও কোমর-হাঁটুর ব্যথা : ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে হাঁটু ও কোমরের জয়েন্ট দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। ফলে অল্প বয়সেই হাঁটুর ব্যথা ও চলাফেরার সমস্যা দেখা দেয়।

৯. অস্টিওপোরোসিস ও হাড় ভাঙা : ডায়াবেটিসে হাড়ের গুণগত মান কমে যেতে পারে। ফলে পড়ে গেলে সহজেই হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিসের রোগীদের হাড় ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দিগুণ। অনেক সময় হাড় জোড়া লাগতেও বেশি সময় লাগে।

১০. সংক্রমণ ও ক্ষত শুকাতে বিলম্ব : ডায়াবেটিসের রোগীদের হাড়ের সংক্রমণ (Osteomyelitis), অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তাই অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়

* রক্তের শর্করা ও HbA1c চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

* প্রতিদিন পা পরীক্ষা করুন এবং খালি পায়ে হাঁটবেন না।

* আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতা ব্যবহার করুন।

* নিয়মিত ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।

* কাঁধ, হাত বা পায়ে ব্যথা বা শক্তভাব অবহেলা করবেন না।

* যেকোনো ক্ষত বা সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা নিন।

ডায়াবেটিস শুধু একটি ‘সুগারের রোগ’ নয়; এটি পুরো শরীরের রোগ। সময়মতো রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত অধিকাংশ অর্থোপেডিক জটিলতা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মনে রাখবেন, সুস্থ হাড় ও সচল জয়েন্ট মানেই একটি কর্মক্ষম ও স্বাধীন জীবন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, শেরেবাংলা নগর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন