আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্লিমিং ইনজেকশনে বাড়ছে ঝুঁকি

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ

স্লিমিং ইনজেকশনে বাড়ছে ঝুঁকি

সাম্প্রতিক সময়ে ওজন কমানোর ইনজেকশন—বিশেষ করে Semaglutide ও Tirzepatide—বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চিকিৎসা আলোচনায়, সর্বত্রই এগুলো দেখা হচ্ছে দ্রুত ওজন কমানোর কার্যকর সমাধান হিসেবে। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম BBC News-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তার বিষয়—এই ইনজেকশন বন্ধ করার পর রোগীরা শুধু ডায়েট ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমানো ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুত আবার ওজন বাড়িয়ে ফেলেন। এই তথ্য আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—দ্রুত ওজন কমানো কি আদৌ স্বাস্থ্যকর ও টেকসই সমাধান?

বিজ্ঞাপন

* ইনজেকশন কীভাবে কাজ করে

এই ওষুধগুলো মূলত GLP-1 receptor agonist শ্রেণির। এগুলো শরীরে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের মতো কাজ করে—

  • ক্ষুধা কমায়।
  • অল্প খাবারেই তৃপ্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে।
  • পাকস্থলীর খাবার হজমের গতি ধীর করে।

ফলে রোগী স্বাভাবিকের তুলনায় কম খাবার গ্রহণ করেন এবং স্বল্প সময়েই ওজন কমে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি—এই ওজন কমা মূলত ওষুধনির্ভর, জীবনধারা বা আচরণগত পরিবর্তনের ফল নয়।

* বন্ধ করলেই কেন দ্রুত ওজন ফিরে আসে

ওষুধ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে শরীর আবার তার স্বাভাবিক হরমোনাল ভারসাম্যে ফিরে যেতে চায়। এর ফলে—

  • ক্ষুধা হঠাৎ বেড়ে যায়।
  • খাবারের প্রতি আকর্ষণ তীব্র হয়।
  • মেটাবলিক রেট প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না।

ফল হিসেবে দেখা দেয় rebound weight gain—অর্থাৎ হারানো ওজন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসে, অনেক ক্ষেত্রে আগের চেয়েও বেশি। এটি শুধু মানসিকভাবে হতাশাজনক নয়, বরং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

* ডায়েট বনাম ইনজেকশন

ডায়েট ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে যারা ওজন কমান, তারা সাধারণত ধীরে ওজন কমান। এই ধীরগতির মধ্যেই তৈরি হয় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস ও দৈনন্দিন আচরণগত পরিবর্তন। ফলে ওজন ফিরে আসার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অন্যদিকে ইনজেকশনের মাধ্যমে দ্রুত ওজন কমলেও, যদি একই সঙ্গে জীবনধারায় পরিবর্তন না আসে। তাহলে ওষুধ বন্ধ করলেই শরীর আবার পুরোনো অভ্যাস ও ওজনে ফিরে যেতে শুরু করে। যার বাস্তব প্রতিফলন বিবিসির প্রতিবেদনে স্পষ্ট।

* স্থূলতা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্থূলতা এখন আর শুধু ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক রোগ, ঠিক যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ। তাই স্লিমিং ইনজেকশনকে স্বল্পমেয়াদি ম্যাজিক সমাধান হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে।

* রোগীকে শুরুতেই জানানো প্রয়োজন

  • ইনজেকশন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার অংশ হতে পারে।
  • হঠাৎ বন্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
  • ওষুধের পাশাপাশি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম অপরিহার্য।

* বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশে দ্রুত ওজন কমানোর আশায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এসব ইনজেকশন ব্যবহার করছেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ স্থূলতার সঙ্গে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ভুল ব্যবহার বা হঠাৎ বন্ধ করা ভবিষ্যতে এসব রোগের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্লিমিং ইনজেকশন সাময়িকভাবে ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। টেকসই ফল পেতে হলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, ওজন কমানোর যুদ্ধে আসল জয় তখনই আসে, যখন আমরা ওষুধের ওপর নয়—নিজের জীবনধারার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

লেখক : কার্ডিওলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...