প্রশ্নবোধক চিহ্নযুক্ত শিরোনাম দিয়ে লেখাটি শুরু করলাম। আমাদের দেশের শিক্ষিত বা অশিক্ষিত রোগী বা সুস্থ মানুষ, অধিকাংশ মানুষ বলে থাকেন যে, হোমিওপ্যাথি একটি প্রাচীন বা মান্ধাতার আমলের চিকিৎসা ব্যবস্থা। এ কথাটাই আমার কানে বাজে। হোমিওপ্যাথি সেকেলে বা প্রাচীন কিংবা মান্ধাতার যুগের চিকিৎসা ব্যবস্থা? এ ক্ষেত্রে আমার সাফ জবাব—না। হোমিওপ্যাথি সেকেলে বা প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থা তো নয়ই, বরং হোমিওপ্যাথিই হলো সর্বাধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা। চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিহাস এবং বর্তমানে প্রচলিত প্রধান ও জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই তিনটি প্রধান চিকিৎসা ব্যবস্থা¬—যথা আয়ুর্বেদিক, এলোপ্যাথি এবং ইউনানির অনেক পরে হোমিওপ্যাথি প্রবর্তিত হয়েছে। যেমন : আয়ুর্বেদিক ঐতিহাসিক যুগে বা প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ধনন্তরি, সুশ্রুতা প্রমুখের মাধ্যমে, এলোপ্যাথি প্রায় ৩০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে বা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে হিপোক্রেটিস, গ্যালেন প্রমুখের মাধ্যমে এবং ইউনানি মধ্যযুগ বা অন্ধকার যুগে—অর্থাৎ ২০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে ইবনে সিনা, আল খারিজি প্রমুখের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয় ।
অন্যদিকে হোমিওপ্যাথি প্রবর্তিত হয় আধুনিক যুগে—অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীতে। আরো স্পষ্ট করে বলতে হলে এটুকু বলা যায়, ১৭৯৬ সালে তৎকালীন বিশ্ব বিখ্যাত, সর্বোচ্চ ফি গ্রহণকারী, চিকিৎসার মাধ্যমে সর্বোচ্চ উপার্জনকারী এলোপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ এমডি ডিগ্রিধারী ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এলোপ্যাথি চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ব্যর্থতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, আরোগ্যের বদলে উপশমদায়ক প্রতিক্রিয়ায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে হোমিওপ্যাথির প্রবর্তন করেন। ওপরের বক্তব্যের মাধ্যমে দুটো বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বলা হলো—একসময়ের বিচারে আয়ুর্বেদিক, এলোপ্যাথিক এবং ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হোমিওপ্যাথি থেকে প্রাচীন। অতএব হোমিওপ্যাথি প্রাচীন মান্ধাতার আমলের নয়; বরং তাদের সবার চেয়ে আধুনিক, আরোগ্যকর, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন, সহজলভ্য এবং সহজবোধ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা। দুই. উল্লিখিত ওই তিনটি প্রাচীন ও অপেক্ষাকৃত কম বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে হোমিওপ্যাথিই অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত। রোগী চিকিৎসার অন্যতম উপাদান হলো ওষুধ। ওষুধ যত সঠিক হবে, রোগারোগ্যে তা তত বেশি কার্যকর ও ফলদায়ক হবে। আর এই ওষুধের রোগারোগ্যের ক্ষমতা বা গুণাগুণ জানা যায় ওষুধ প্রভিংয়ের মাধ্যমে। তথাকথিত আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলোয় ওষুধের প্রুভিং করা হয় ইতর প্রাণীতে। যেমন : ইঁদুর, বানর ও গিনিপিগের ওপরে । যারা তাদের দেহমনে ওষুধ বা ভেষজ প্রয়োগ-পরবর্তী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম। সম্প্রতি তারা মানুষের ওপরেও ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে শুরু করেছেন, যে মানুষগুলো কোনো একটি রোগে আক্রান্ত কিন্তু তাদের মনোদৈহিক লক্ষণ বিভিন্ন ধরনের। উল্লিখিত উভয় ক্ষেত্রেই ভেষজের সঠিক গুণ কিংবা রোগারোগ্যের সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে হোমিওপ্যাথিতে ভেষজ পরীক্ষিত বা প্রভিং করা হয় সুস্থ, জ্ঞানী ও সত্যবাদী মানুষের ওপর। হোমিওপ্যাথির তত্ত্বানুসারে কোনো ভেষজ স্থূলমাত্রায় প্রয়োগে সুস্থ মানবের দেহ মনে যে রোগ সৃষ্টি করে, সেই ভেষজই সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগে ওই রোগীকে অরোগ্য করে। এটাকেই বলে সদৃশ দ্বারা সদৃশের অরোগ্য বা ‘সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার’। এ জন্যই হোমিওপ্যাথির অপর নাম ‘সদৃশ বিধান’।
ওপরের আলোচনার মাধ্যমে দুটো বিষয় পরিষ্কার করা হলো। এক. জনপ্রিয় অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে হোমিওপ্যাথি মান্ধাতার বা প্রাচীন যুগের নয়; বরং তাদের চেয়ে আধুনিক এবং চিকিৎসার মূল উপাদান ওষুধ প্রভিং বা পরীক্ষার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি বিজ্ঞানসম্মত এবং নির্ভরযোগ্য। অনেকে না জেনে বলেন, হোমিওপ্যাথিতে রোগ পরীক্ষা নেই, সার্জারি নেই, ফার্স্টএইড নেই ইত্যাদি। আসলে এগুলোও তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞানেরই প্রমাণ। হোমিওপ্যাথিতে ডিপ্লোমা এবং স্নাতক (ডিএইচএমএস এবং বিএইচএমএস) কোর্স চালু আছে। উভয় কোর্সেই এনাটমি, ফিজিওলজি, গাইনি-অবস, প্যাথলজি এবং সার্জারি বিষয়ে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক পাঠদান ও পরীক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এদেশে কোনো হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল না থাকায় ওই বিষয়গুলোর চর্চা ও পারদর্শিতা দেখানোর সুযোগ থেকে হোমিওপ্যাথরা বঞ্চিত। অথচ পাশের দেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, তদারকি এবং প্রতিটি হোমিওপ্যাথি কলেজসংলগ্ন হাসপাতাল থাকা ও তাদের কার্যক্রম তদারকির ফলে সেখানে প্যাথলজিক্যাল ডায়াগনসিস, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশন, সার্জারি হোমিও চিকিৎসকরাই করছেন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (অব.)
ফেডারেল হোমিপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

