গবেষণায় নতুন আশার আলো

সপ্তাহে একবার ইনজেকশনে নিয়ন্ত্রণে থাকবে ডায়াবেটিস, কমবে ওজন

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

সপ্তাহে একবার ইনজেকশনে নিয়ন্ত্রণে থাকবে ডায়াবেটিস, কমবে ওজন

টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্থূলতা মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে সপ্তাহে একবার নেওয়া ‘ট্রিপল-অ্যাকশন’ ইনজেকশন রেটাট্রুটাইড । সম্প্রতি প্রকাশিত ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গেছে, এই নতুন ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পাশাপাশি শরীরের ওজনও ব্যাপকভাবে কমাতে সক্ষম।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণায় ৯৩০ জন টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেউই আগে ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণ করছিলেন না। তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যাপ্তভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল না এবং সবার বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ছিল অন্তত ২৩।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৪, ৯ অথবা ১২ মিলিগ্রাম রেটাট্রুটাইড কিংবা প্লাসেবো দেওয়া হয়। ৪০ সপ্তাহ ধরে তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা (এইচবিএ১সি), ওজন, কোলেস্টেরল, রক্তচাপ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, রেটাট্রুটাইড গ্রহণকারীদের এইচবিএ১সি গড়ে ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে, যেখানে প্লাসেবো গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ০ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট। একই সময়ে রেটাট্রুটাইড গ্রহণকারীদের শরীরের ওজন গড়ে ১১ দশমিক ৫ থেকে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, যা প্লাসেবো গ্রুপের ২ দশমিক ৬ শতাংশ ওজন হ্রাসের তুলনায় চার গুণেরও বেশি।

গবেষকদের মতে, রেটাট্রুটাইডের বিশেষত্ব হলো এটি একসঙ্গে তিনটি অন্ত্র-হরমোন জিএলপি-১, জিআইপি এবং গ্লুকাগনের কার্যকারিতা অনুকরণ করে। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ওজেম্পিক ও ওয়েগোভি মূলত জিএলপি-১ কে অনুসরণ করে ক্ষুধা কমায়, আর মাউনজারো জিএলপি-১ ও জিআইপির সমন্বয়ে কাজ করে। তবে রেটাট্রুটাইড অতিরিক্তভাবে গ্লুকাগন রিসেপ্টর সক্রিয় করে শরীরের শক্তি ব্যয়ও বাড়ায়, যা ওজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের উন্নতিও লক্ষ্য করা গেছে। যদিও ১৪ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, এর মধ্যে দুজন ছিলেন প্লাসেবো গ্রুপে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার এবং সময়ের সঙ্গে তা কমে যায়। পরিপাকতন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যা ছিল সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

গবেষকরা মনে করছেন, যেসব রোগীর টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের জন্য এই নতুন ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে আরো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলমান রয়েছে।

স্থূলতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাথ ম্যাককালো বলেন, ডায়াবেটিস ও স্থূলতায় ভোগা অনেক মানুষের জন্য এ ধরনের চিকিৎসা সত্যিকার অর্থেই জীবন বদলে দিতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ওষুধ কোনো ‘জাদুকরী সমাধান’ নয়; দীর্ঘমেয়াদে মানুষের এমন অবস্থায় পৌঁছানোই রোধ করতে হবে যাতে তাদের এসব ওষুধের প্রয়োজন না হয়।

অন্যদিকে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএমএস এপিডেমিওলজির বিশেষজ্ঞ ডা. মেরি স্প্রেকলি বলেন, গবেষণায় দেখা ওজন হ্রাসের মাত্রা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তবে এই গবেষণায় রেটাট্রুটাইডকে বর্তমান জনপ্রিয় ওষুধ সেমাগ্লুটাইড বা টিরজেপাটাইডের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা হয়নি। ফলে এটি বিদ্যমান চিকিৎসার তুলনায় কতটা বেশি বা কম কার্যকর, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র ওজন কমানোই সর্বোত্তম স্বাস্থ্যগত ফল নিশ্চিত করে না। চিকিৎসার সময় রোগীদের পর্যাপ্ত পুষ্টি, পেশিশক্তি সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

ডায়াবেটিস ইউকের গবেষণা ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ডা. লুসি চেম্বার্স বলেন, এই ফলাফলগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। নতুন এই শ্রেণির ওষুধ একই সঙ্গে ওজন কমানো এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত সুবিধা দিতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং বর্তমানে ব্যবহৃত চিকিৎসার সঙ্গে তুলনামূলক কার্যকারিতা জানতে আমরা আরো গবেষণার অপেক্ষায় রয়েছি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...