ঈদ বাংলাদেশের মানুষের জীবনের এক বিশেষ আনন্দ ও উদযাপনের অনুষ্ঠান। বছরের এই দিনেই দেশের সব শ্রেণির মানুষ উৎসবে মেতে ওঠে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঈদের বিনোদনের ধরনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ডিজিটাল এ যুগে ঈদের আনন্দ ও বিনোদন আরো প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। আজকের এই আধুনিক যুগে প্রযুক্তি কীভাবে ঈদ উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব
আগেকার দিনে ঈদ মানে ছিল সবার বাড়িতে যাওয়া। পুরো পরিবার ও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া, যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদি মানুষের ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনলাইনে লাইভ স্ট্রিমিং, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়, ছবি ও ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা এখন খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, যারা দেশের বাইরে, কিংবা প্রিয়জনদের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এই মাধ্যমগুলো ঈদের আনন্দ উপভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রভাব
অতীতে ঈদের ছুটিতে মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল টেলিভিশন ও রেডিও। ঈদের বিশেষ নাটক, সিনেমা, এবং ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতে সবাই একত্রিত হতো টেলিভিশনের সামনে। তবে, বর্তমানে অনেকেরই বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। নেটফ্লিক্স, হইচই, চরকি ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মে ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় নতুন নতুন সব সিনেমা, নাটক ও ওয়েব সিরিজ। বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো অন্যতম বিনোদন মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পরিবারের সঙ্গে বসে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এসব কনটেন্টগুলো উপভোগ করে অনেকেই ঈদের আনন্দকে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
অনলাইন গেমিং ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রভাব
নব্বইয়ের দশক, এমনকি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, এ দেশে ঈদ এলেই আয়োজন করা হতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। যেমন লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, ও নৌকাবাইচ খেলা। এমনকি আয়োজন করা হতো বিভিন্ন মেলা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন এসব সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখনকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনলাইন গেমিং ঈদের বিনোদনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে। ঈদ উপলক্ষে আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন মাল্টিপ্লেয়ার গেমের। এ ছাড়া, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন ভার্চুয়াল ইভেন্ট ও কনসার্ট উপভোগের সুযোগও বাড়ছে।
ই-কমার্স ও অনলাইন শপিং এর প্রভাব
আগেকার দিনে ঈদ এলেই নতুন জামা-কাপড় কেনার ধুম পড়ে যেত দোকানগুলোতে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া সেখানেও লেগেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের কেনাকাটায় প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ অফার ও ডিসকাউন্ট দেওয়া হচ্ছে, যা ক্রেতাদের দৃষ্টিআকর্ষণ করছে। এতে করে ক্রেতাদের সময় ও পরিশ্রম দুটিই বাঁচে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং এর প্রভাব
ঈদের সময় স্বাভাবিকভাবেই লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। আগেকার দিনে যেখানে নগদ টাকা ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন ডিজিটাল পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেকেই বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজেই টাকা পাঠানো ও কেনাকাটা করছেন। এতে নগদ টাকার ঝামেলা কমেছে এবং লেনদেন আরো নিরাপদ হয়েছে। এর পাশাপাশি, ঈদ উপলক্ষে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমে অনেক ধরনের ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলো, যা ক্রেতাদের ডিজিটাল পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।
ক্যাশলেস সালামির প্রভাব
আগে ঈদের দিনে বড়রা ছোটদের হাতে ঈদের সালামি হিসেবে নগদ টাকা তুলে দিতেন। ঈদের দিনের অন্যতম আনন্দদায়ক পর্ব ছিল সালামি দেওয়া-নেওয়া। তবে বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনের জনপ্রিয়তার কারণে ক্যাশলেস সালামির প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে সালামি পাঠানো এখন আনন্দ ভাগাভাগির অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা দূরে থাকেন, তারা সহজেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে প্রিয়জনদের সালামি পাঠিয়ে দিতে পারেন।
ভার্চুয়াল আড্ডার প্রভাব
এ ছাড়া ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ঈদের আড্ডার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। যারা প্রবাসে থাকেন বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি ঈদ উদযাপন করতে পারেন না, কিংবা দূর-দূরান্তের বন্ধুবান্ধবের ঈদ আড্ডায় জুম, গুগল মিট, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার ব্যবহার করে ভার্চুয়াল আড্ডার আয়োজন করেন অনেকেই। এতে দূরত্ব থাকলেও হৃদয়ের বন্ধন অটুট থাকে এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা সম্ভব হয়।
আধুনিক যুগে প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। আর এর ছাপ আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতেও পড়েছে। ঈদ উদযাপনের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন, কেনাকাটা, লেনদেন থেকে শুরু করে ঈদের সালামি, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষণীয়, যা প্রযুক্তিকে ঈদ উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

