নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারির উপস্থিতির একটি দাবি সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি ও ভিডিওতে তাকে অনুষ্ঠানের মঞ্চে দেখা গেছে।
২৯ আগস্ট ‘সর্বজনীন ঐক্য উদ্যাপন’ নামে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমেরিকান হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ (এএইচইডি) ফোরাম। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে ৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেয়। ৩০টি দেশের ১৮০ জন ধর্মীয় নেতা এতে অংশ নিয়ে ভবিষ্যৎ বিশ্বের জন্য পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তাদের একজন ছিলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। আয়োজনটির মূল বক্তব্য ছিল ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে মানবিক ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ। তবে অনুষ্ঠানের আগে ও পরে আরএসএসের মতাদর্শ ও মোহন ভাগবতের উপস্থিতি নিয়ে নিউইয়র্কে প্রতিবাদ হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান ও ধর্মীয় নেতা সাইফুদ্দীন মাইজভান্ডারির ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চে থাকার দাবি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তবে তিনি কী পরিচয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, তিনি কোনো বক্তব্য দিয়েছেন কি না কিংবা মোহন ভাগবতের সঙ্গে তার কোনো বৈঠক হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) যুগ্ম মহাসচিব ও দপ্তর সম্পাদক মো. ইব্রাহিম মিয়ার দাবি, ‘তিনি আরএসএস প্রধানের কোনো অনুষ্ঠানে যাননি। তবে তিনি দেশের বাইরে আছেন।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, ‘তিনি নিউইয়র্কে আরএসএসের অনুষ্ঠানে কখন গেছেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।’

যে ছবি ঘিরে আলোচনা
আরএসএসের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত অনুষ্ঠানের একটি ছবিতে মোহন ভাগবতের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় পোশাক ও পরিচয়ের ব্যক্তিদের দেখা যায়। ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওর ভিত্তিতে দাবি করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সাইফুদ্দীন মাইজভান্ডারিও রয়েছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকার নাইন সায়েরও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
‘সর্বজনীন ঐক্য উদ্যাপন’ অনুষ্ঠানটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানটির সমালোচনা করেন। তিনি আরএসএসের মতাদর্শকে বর্জনমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত বলে মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের বাইরে বিভিন্ন মানবাধিকার ও দক্ষিণ এশীয় সংগঠনের কর্মীরাও বিক্ষোভ করেন। প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, আরএসএসের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, ‘ঐক্য’ ও ‘সর্বজনীনতার’ ভাষা ব্যবহার করে আরএসএসের বিতর্কিত মতাদর্শকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আরএসএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। সংগঠনটি নিজেদের একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। মোহন ভাগবত অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কথা বলেন। তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের তারা যে দেশে বসবাস করেন, সেই দেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানান।
সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সঙ্গে তার পারিবারিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত সাইফুদ্দীন মাইজভান্ডারির দুটি পরিচয়ের কারণে। একদিকে তিনি একজন ধর্মীয় নেতা, অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান। আর যে অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির দাবি উঠেছে, তার প্রধান বক্তা মোহন ভাগবত। আরএসএস ভারতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি সংগঠন। সংগঠনটি নিজেদের সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিলেও হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ ও ভারতের সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যানের ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চে থাকার বিষয়টি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে ধর্মীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতাদর্শিক যোগাযোগের প্রশ্নও সামনে আসছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


