একজন রোগী হাসপাতালে গেলেন। চিকিৎসক তার রিপোর্ট দেখছেন। আর একই সময়ে কম্পিউটার একটি এক্স-রে বা স্ক্যান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য রোগের কয়েকটি সংকেত দেখিয়ে দিল। কোথাও অস্বাভাবিকতা থাকলে সেটি চিকিৎসকের নজরে এনে বলল—‘এই অংশটি আরো ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার।’ শুনতে অনেকটা ভবিষ্যতের গল্পের মতো হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI (Artificial Intelligence) এরই মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, চোখের ছবি, ত্বকের ক্ষত কিংবা বিভিন্ন মেডিকেল ডেটা বিশ্লেষণে এআই চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—একদিন কি এআইই চিকিৎসকের জায়গা নেবে?
এআই রোগ শনাক্তকরণকে সহজভাবে বোঝা যায় ‘ডেটা থেকে অস্বাভাবিকতা খুঁজে বের করার’ প্রযুক্তি হিসেবে। একটি এআই মডেলকে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসা-সংক্রান্ত ছবি বা তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে কোন ছবিতে রোগের লক্ষণ ছিল এবং কোনটিতে ছিল না। এমন উদাহরণ থেকে মডেল নির্দিষ্ট ধরনের প্যাটার্ন চিনতে শেখে। পরে নতুন কোনো মেডিকেল ছবি বা ডেটা দিলে এআই সেটির সঙ্গে আগে শেখা বৈশিষ্ট্যগুলোর মিল খুঁজে সম্ভাব্য অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে পারে।
ধরা যাক, হাজার হাজার ফুসফুসের এক্স-রে বিশ্লেষণ করে একটি এআই মডেল প্রশিক্ষিত হয়েছে। নতুন একটি এক্স-রে দিলে সেটি ফুসফুসের কোনো অংশে অস্বাভাবিক ছাপ, গঠন বা নির্দিষ্ট ধরনের পরিবর্তন খুঁজে দেখতে পারে। একইভাবে চোখের রেটিনার ছবি বিশ্লেষণ করে ডায়াবেটিস-সম্পর্কিত চোখের ক্ষতির সংকেত শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ এআই অনেক ক্ষেত্রে ‘রোগের নাম বলে দেওয়া যন্ত্র’ নয়। বরং চিকিৎসকের জন্য সম্ভাব্য অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করার একটি সহায়ক প্রযুক্তি।
এর বড় সুবিধা হলো দ্রুত বিশ্লেষণ। একজন চিকিৎসককে একই ধরনের অসংখ্য ছবি বা রিপোর্ট দেখতে হলে সময় লাগতে পারে। এআই বড় পরিমাণ ডেটা দ্রুত বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক বিষয়গুলো আলাদা করে দেখাতে পারে। বিশেষ করে এমন হাসপাতালে যেখানে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে এআই কোনো রিপোর্ট বা ছবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে চিকিৎসকের নজরে আনতে সাহায্য করতে পারে। এতে চিকিৎসক গুরুত্বপূর্ণ কেসগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করার সুযোগ পেতে পারেন।
এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো প্রাথমিক শনাক্তকরণ। কোনো রোগের শুরুতেই যদি তার সূক্ষ্ম লক্ষণ পাওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসককে দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এআই এমন ছোট পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষের চোখে সহজে ধরা নাও পড়তে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করলেই যে রোগটি নিশ্চিতভাবে আছে, তা নয়। সেটি হতে পারে আরো পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার একটি সংকেত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো মেডিকেল ইমেজিং। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও আলট্রাসাউন্ডের মতো বিভিন্ন ছবিতে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার কাজে মেশিন লার্নিং ও গভীর শিক্ষণ (Deep Learning) প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। আবার হৃদরোগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, চোখের রোগ শনাক্তকরণ, ক্যানসারের কিছু বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ এবং রোগীর বিভিন্ন তথ্য থেকে ঝুঁকি অনুমানের মতো ক্ষেত্রেও কাজ হচ্ছে।
তবে এআই যতই উন্নত হোক, এর ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি এআই মডেল যে ধরনের রোগী, যন্ত্র বা ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্ন হলে ফলাফলের নির্ভুলতা কমে যেতে পারে। কোনো দেশের হাসপাতালের ডেটা দিয়ে তৈরি মডেল অন্য দেশের ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। ছবির মান খারাপ হলে, তথ্য অসম্পূর্ণ হলে কিংবা রোগটি খুব অস্বাভাবিক হলে এআই ভুল সংকেত দিতে পারে। আরেকটি বড় বিষয় হলো এআই কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। অনেক উন্নত এআই মডেলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া মানুষের কাছে পুরোপুরি সহজবোধ্য নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুধু ‘এআই বলেছে’ যথেষ্ট নয়। কেন এমন ফল এসেছে, রোগীর অন্যান্য লক্ষণ ও পরীক্ষার ফলের সঙ্গে তা মিলছে কি না। এসবও বিবেচনা করতে হয়। এ কারণেই এআইয়ের ফলকে চিকিৎসকের মূল্যায়নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের কাজ শুধু একটি রিপোর্ট বা ছবি দেখে রোগের সম্ভাবনা বলা নয়। রোগীর বয়স, আগের রোগ, ওষুধ, শারীরিক লক্ষণ, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাপন এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল—সবকিছু মিলিয়ে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। একজন রোগী একই রিপোর্ট নিয়ে এলেও তার শারীরিক অবস্থা অন্য রোগীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এই মানবিক ও সামগ্রিক বিচার করার জায়গাটি এআইয়ের জন্য অত্যন্ত জটিল।
তাই এআইকে চিকিৎসকের বিকল্পের চেয়ে সহকারী হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত। এআই দ্রুত ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে। সন্দেহজনক জায়গা চিহ্নিত করতে পারে। বড় পরিমাণ তথ্য সাজিয়ে দিতে পারে এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে এআইয়ের কোনো ফলের ওপর ভিত্তি করে নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা নিরাপদ নয়।
এআই ব্যবহারের সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মেডিকেল রেকর্ড অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য। রোগীর রিপোর্ট বা ছবি কোনো এআই ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হলে সেই তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে। কে দেখতে পারছে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা ও নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে পক্ষপাত বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায় কার—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

