আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কুরতুবা থেকে ঢাকা, ইকবালের অসমাপ্ত জিহাদ

এবাদুর রহমান

কুরতুবা থেকে ঢাকা, ইকবালের অসমাপ্ত জিহাদ

১৯৩০ ঈসায়ী, ২৯ ডিসেম্বর, আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের জীবন ও এই উপমহাদেশের ইতিহাসে একটা ওয়াটারশেড মুহূর্ত হইতেসে এলাহাবাদে, ওল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশন; এই অধিবেশনে প্রদত্ত তার ভাষণে ইকবাল প্রথমবারের মতো উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলিকে একত্রিত কইরা একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের নাখোজাবাদী স্বপ্ন উপস্থাপন করেন। এই ভাষণে বলা হইল, এই রাষ্ট্রে মুসলমানেরা নিজ কওমের মূল্যচেতনা ও আদর্শ অনুসারে জীবনযাপন করতে পারবে। এই ভিশনারি ভাষণই পাকিস্তান রাষ্ট্রের বুনিয়াদ; আর কিছু নয়।

১৯৩১ ঈসায়ীর ২৭ ফেব্রুয়ারি, এলাহাবাদেরই, আলফ্রেড পার্কে, অগ্নিপুত্র বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ দিনদুপুরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন; আজাদ মায়ের কাছে কসম খাইসিলেন যে, তাকে কেউ জিন্দা ধরতে পারবে না। এই মৃত্যু আমূল কাঁপায় দেয় ব্রিটিশ রাজকে। লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয় ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুর। মাতৃভূমির এই বীর সন্তানদের কোরবানিতে বিস্রস্ত ইকবাল, দ্বিতীয় গোলটেবল বৈঠকে যোগদান করতে বিলাত আসেন। একটু অনুপ্রেরণার খোঁজে তিনি এইখান থেকে পৌঁছান আন্দালুস। ইবেরীয় উপদ্বীপে, কর্ডোবার খিলাফতের রাজধানী, মাদীনাতুজ জাহরার ধ্বংসস্তূপে তিনি একা একা হাঁটেন। এক সূর্যাস্তকালে, কর্দোবার বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল-মসদিজের সামনে তার কাছে, অপূর্ব ওহির মতো উদয় হয় ‘মসজিদে কুরতুবা’ কবিতাটি। তিনি এটি তার ‘বাল-এ-জিবরিল’ কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

পতনের ভূগোল, পুনরুত্থানের আত্মা

এখানে বোঝা জরুরি যে, ইকবালকে আন্দালুসে এনে ফেলসিল কোনো আকস্মিক ভ্রমণপিপাসা না; তাকে টেনে আনসিল এক অন্তর্লীন বেদনা, আর এক অদ্ভুত কৌতূহল যে, মুসলিম ইতিহাসের পতনস্পর্শে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভারতীয় উপমহাদেশীয় মুসলিম কীভাবে নিজের ভবিষ্যতের মানচিত্রটা পড়ে। সেই সময় ইউরোপের বুকে মুসলিম ক্ষমতার রাজনৈতিক স্মৃতি অনেকটাই অদৃশ্য, আর উপমহাদেশে মুসলমানদের আত্মবিশ্বাসও টালমাটাল।

ইকবাল ঠিক তখনই আন্দালুস গিয়েসিলেন, যেন ইতিহাসের মৃতপ্রান্তে স্পর্শ নিয়ে দেখতে চান জীবনের পালস এখনো আছে কি না। কুরতুবার মসজিদে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন এক অদ্ভুত মিলনক্ষেত্র, যেখানে উম্মাহর উচ্চচূড়া একসময় আকাশ ছুঁইসিল, আর একই সঙ্গে সেই শিখার পতনের ধুলো গায়ে মেখে আজকের মুসলিমরা নূতন পথ খুঁজছে। আন্দালুস ছিল তার কাছে একটা দ্রষ্টব্য চিহ্ন, যা দেখিয়ে দেয় কিভাবে সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, কিন্তু আত্মিক নির্মাণ অটুট থেকে মানবজমিনে নূতন বীজ ফেলতে থাকে।

এটা ছিল তার জন্য এক পরীক্ষাগার, যেখানে তিনি রাজনৈতিক পতনের পরও ভাবগত স্থায়িত্বের প্রমাণ খুঁজসিলেন।

বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের একজন মুসলমান হিসেবে তার অভিজ্ঞতা ছিল ভঙ্গুরতার ওপর দাঁড়ানো—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির চাপ, মুসলিম সমাজের বিভ্রান্তি, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের পাহাড়। সেই অবস্থায় তিনি আন্দালুসে এসে একটি ভিন্ন রকমের শিক্ষা পেলেন: ক্ষমতা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ইশ্‌কের ভিতরে নির্মিত মানসিক জগৎকে সময় ছুতে পারে না।

এ শিক্ষা সরাসরি উপমহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে গেল, কারণ সেখানে মুসলমানদের সামনে রাজনৈতিক পতন, আত্মপরিচয়ের সংকট আর আধুনিকতার চাপে বিশ্বাসের অবক্ষয়—সব একসঙ্গে ঘটছে। কুরতুবা তাকে দেখাল যে উম্মাহ কোনো ভৌগোলিক মালিকানার নাম না,

বরং এক ঐতিহাসিক স্নায়ুতন্ত্র।

সেই স্নায়ুক্ষতির অভিজ্ঞতা যেমন আন্দালুসে ঘটসে, তেমনি তার নিজস্ব সভ্যতার ইতিহাসেও প্রতিধ্বনিত। তাই মসজিদে দাঁড়িয়ে তিনি উম্মাহর অতীতের গৌরবকে স্মরণ করছেন বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি উপমহাদেশীয় মুসলমানের বর্তমানকে পড়ছেন এবং ভবিষ্যতের একটা আধ্যাত্মিক নকশা নির্মাণ করছেন।

ইশক ও খুদি : দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের হৃদয়

‘মসজিদে কুরতুবা’ কবিতার কেন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক টান হলো ইশক এবং খুদি (আত্মসত্তা)-র মধ্যে এক গভীর দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, যা হেগেলীয় অর্থে মাস্টার-স্লেভ ডায়ালেকটিকসের মতো কাজ করে; কিন্তু এখানে দাসত্ব নয়, বরং আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আত্মার পূর্ণতা আসে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন