আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দৃষ্টির কারিগর

আল পারভেজ

দৃষ্টির কারিগর

শহরের ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে লোকটা বসে থাকে। সামনে একটা ছোটো কাঠের টেবিল। তার ওপর থরে থরে সাজানো রকমারি লেন্স আর কাচের টুকরো। সে চশমা সারায় না। সে মানুষের দৃষ্টি পরিষ্কার করে। তার কাছে ভিড় খুব একটা নেই, আবার টেবিলটা কখনো ফাঁকাও থাকে না।

একদিন এক যুবক এলো। তার পরনে দামি পোশাক, চোখে রাজ্যের ক্লান্তি। সে বলল, ‘সবকিছু ঝাপসা দেখি। মনে হয় চারপাশের পৃথিবীটা ধূসর হয়ে গেছে।’

বিজ্ঞাপন

কারিগর হাসল। তার হাসিটা হেমন্তের ঝরা পাতার মতো শব্দহীন। সে এক টুকরো রেশমি কাপড় দিয়ে যুবকের চোখের চশমাটা মুছল না, বরং তার ঝুলি থেকে বের করল ছোট্ট একটা স্ফটিক; বলল, ‘এটি চোখের সামনে ধরুন। বাইরের জগৎ দেখার আগে ভেতরের জগৎটা একবার দেখে নিন।’

যুবক স্ফটিকটি চোখে ঠেকাল। সে দেখল, এক বিশাল মরুভূমি। সেখানে একটা ছোটো চারাগাছ জলের তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে, অথচ তার পায়ের নিচেই বইছে স্বচ্ছ জলের ধারা। যুবক অবাক হয়ে চাইল। কারিগর ধীর গলায় বলল, ‘যাকে আপনি দূরে খোঁজেন, সে আপনার পায়ের নিচেই থাকে। শুধু নিচের দিকে তাকানোর অভ্যাসটা আমাদের নেই।’

কারিগর একেকজনকে একেক রকম কাচ দেয়। কেউ সেই কাচে নিজের হারানো শৈশব দেখতে পায়, কেউ দেখতে পায় আগামীর কোনো উজ্জ্বল সম্ভাবনা। লোকটা কোনো পারিশ্রমিক নেয় না। লোকে যা দেয়, তা-ই সই। তবে তার একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। সে সবার চোখের অস্পষ্টতা দূর করলেও নিজের চোখ দুটো সবসময় বন্ধ রাখে।

একদিন এক কৌতূহলী বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা, তুমি সবার চোখের সামনে সত্যকে তুলে ধরো, কিন্তু নিজে চোখ বন্ধ করে রাখো কেন? তুমি কি অন্ধ?’

কারিগর এবারও মৃদু হাসল। সে তার টেবিলের ওপর থেকে একটা পুরোনো দর্পণ তুলে বৃদ্ধের সামনে ধরল। বৃদ্ধ দর্পণে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন। দর্পণে কারিগরের কোনো প্রতিচ্ছবি নেই! সেখানে কেবল একটা শূন্য চেয়ার আর টেবিল পড়ে আছে।

বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, ‘এ কী জাদু! তুমি কোথায়?’

বাতাসে একটা নিবিড় কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—‘আমি তো কেউ নই। আমি মানুষের আত্মোপলব্ধির একটা ছায়া মাত্র। যখন কেউ নিজেকে চিনতে পারে, তখন আমার আর প্রয়োজন থাকে না।’

বৃদ্ধ চোখ রগড়ে আবার তাকালেন; দেখলেন, সামনে কোনো টেবিল নেই, কোনো কারিগর নেই। রাস্তার মোড়ে কেবল একটা ধুলোমাখা ভাঙা আয়না পড়ে আছে। সেই আয়নার এক কোণে ছোট করে লেখা—‘মানুষ নিজেকে দেখতে পায় কেবল তখনই, যখন সে অন্যকে দেখতে শেখে।’

বৃদ্ধ সেই ভাঙা আয়নাটা হাতে নিলেন। আয়নায় এখন বৃদ্ধ নিজের মুখটি দেখতে পাচ্ছেন, যা আগে কখনো এতটা উজ্জ্বল মনে হয়নি। রাস্তার কোলাহল ছাপিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে গ্রাস করল। তিনি হাসলেন—কারিগরের মতোই শব্দহীন সেই হাসি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন