আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

তকদির

হাসান ইশরাফ

তকদির

আমি পিএইচডি করছি আমেরিকায়। যে প্রফেসরের অধীনে কাজ করছি, তার নাম ড. মরিয়ম কুর্দি। তার মা-বাবা কর্দিস্তান থেকে আমেরিকায় চলে আসেন তিনি ছোট থাকতেই। তবে তিনি ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ধরে রেখেছেন।

পিএইচডির কাজ অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং মাঝে মাঝে বৈরাগী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। একদিন মরিয়মকে বলেই ফেললাম, ‘মরিয়ম, যেভাবে দিন যাচ্ছে, আমার সংসার ভাঙতে মনে হয় বেশি দেরি নেই।’

বিজ্ঞাপন

মরিয়ম খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘তোমার সংসার এখনো টিকে আছে? গুড জব!’

আমি তো জবরজং থ! আমার আজকের অবস্থা দেখে মরিয়ম বুঝলেন আজ আর কাজ এগোবে না। তারপর তিনি তার প্রথম জীবনের একটা গল্প বলা ধরলেন, ‘সেসময় গ্র্যাজুয়েশন শেষ করাটা আজকের চেয়ে অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। বহু বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে গ্র্যাজুয়েট হলাম। কিন্তু রেসপেকটিভ কোনো জব পাওয়া যাচ্ছে না। কী করি কী করি—সারা দিন এই ভাবনা। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করি ক্ষণে ক্ষণে। বাবা-মায়ের ওপর তো এত দিন ডিপেনডেন্ট থাকা যায় না। একবার বহু কষ্টে একটা পরীক্ষায় টিকে গেলাম। এখন ভাইভার ওয়েটিং রুমে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বুঝলাম, এখন পর্যন্ত কাউকে সিলেক্ট করা হয়নি। কারণ যারা গেছে তারা সবাই শিউর যে তারা জবটা পাবে না, অথচ নেওয়া হবে কেবল একজনকে।

অন্যের পরাজয় দেখে আনন্দ পাওয়া অন্যায়; কিন্তু মনে একটা আশা জাগল, কারণ আমার পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। উপরন্তু ইন্টারভিউর প্রিপারেশনও বেশ। অ্যাজ ইউ নো, মাই মেমোরি ইজ কুয়াইট গুড এভার সিনস। অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ দেখলাম, আমার দু-তিন সিট পরে বসে আছে অ্যানজেলিনা। সে আমার বান্ধবী। পড়ার খরচ জোগাতে না পেরে ড্রপ-আউট হয়ে যায় ইউনিভার্সিটি থেকে। সে সময়ও ব্ল্যাক পিপলদের সঙ্গে ডিসক্রিমিনেশন করা হতো। আর সে ছিল নিগ্রো; এবং সত্যি কথা বলতে ভীষণ গরিব। সে আমাকে দেখে কেমন যেন দমে গেল। সে ছাত্রী হিসেবে আমার চেয়ে ভালো ছিল না, এজন্যই হয়তো।

আমি থাকতে চাকরিটা তার হবে না—এই ছিল সম্ভবত তার ভাবনা। অন্যদিকে দেখা গেল, কেউই ভালোমতো ইন্টারভিউটা দিতে পারেনি। কেবল আমি আর অ্যান বাকি। আমরা দুই আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছি প্রতিদ্বন্দ্বী। আমারও চাকরিটা ভীষণ দরকার। তারও একই অবস্থা। অ্যানের আমার ওপর কোনো ক্ষোভ নেই ঠিকই, কিন্তু তার মুখ দেখেই বলে দেওয়া যায়, কেবল দিতে হয় বলেই সে ভাইভাটা দেওয়ার জন্য বসে আছে।

আমার ডাক পড়ল একসময়। আমি ভাইভা দিয়ে বের হলাম। দেখি ওয়েটিংরুমে সে নেই। খোঁজাখুঁজি করে তাকে পেলাম ওয়াশরুমে। সে কাঁদছে। ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট দেয়ার ইজ নো হোপ ফর মি,’ সে বলল।

আমি বললাম, ‘আই হ্যাভ নো হোপ ইদার। কজ আই ডিডন্ট আনসার দা কোয়েশ্চেনস।’

অ্যান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। যাহোক চাকরিটা সে পেয়ে গেল। আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আর অলমাইটির কী দয়া! তার কিছুদিন পরেই আমি হয়ে গেলাম ইউনিভার্সিটি লেকচারার। অ্যান্ড ইউ ক্যান সি হোয়ার আই অ্যাম নাউ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন