চাঁদ ও মোটরসাইকেল

অস্ট্রিক আর্যু

চাঁদ ও মোটরসাইকেল

বর্ষার শেষদিকের এক নাবালক রাতে যখন আকাশের চাঁদ চিতল মাছের পেটের দিকটার মতো সাদা সাদা আলো ছড়াতে থাকবে, তখন সেলামইত গ্রামে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে—যে ঘটনার পর থেকে অনেকেই লক্ষ করবে, স্থানীয় সাদা সাদা বকগুলো আইড়ল বিল থেকে গ্রামের দক্ষিণে কফিলুদ্দিন মোল্লার বাগানবাড়ির উঁচু উঁচু বাঁশের ঝোপে তাদের নীড়ে ফেরার সময়ে কেন জানি আর সরলরেখায় উড়ছে না, আর অত্র থানাভুক্ত কোনো কোনো অচ্ছুত পুকুরের ঘন কচুরিপানার নিচে ঘুমিয়ে থাকা নিখোঁজ মৃতেরা কেন জানি মাঝেমধ্যে নিজেদের নাম ভুলে জেগে উঠছে।

সেদিন দুপুরে পুকুরের জলের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের মিনারের ছায়া যখন ঈষৎ কাঁপতে থাকবে, তখন গ্রামের নতুন মাতবর আনোয়ার হোসেন মোল্লা ওরফে আনু মোল্লা উঠোনে বসে তার রুপালি মোটরসাইকেলটিকে নরম একটি সাদা সুতি কাপড় দিয়ে আরো বেশি নরম হাতে মুছতে থাকবেন।

বিজ্ঞাপন

একবার।

দুবার।

তিনবার।

আজ যদিও দুপুর, কিন্তু সচরাচর মোটরসাইকেলটিকে নিয়ে বাইরে বেরোবার আগে প্রতিবার এইভাবে পরিষ্কার করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এছাড়া শুক্রবারে জুমআর নামাজের আগে আগে আনু মোল্লা যে তরিকায় নিজেকে গোসল করিয়ে সাফসুতরো করে, ঠিক ঐভাবে সে তার মোটরসাইকেলটিকেও তৈরি করে; যেনবা সাইকেলটিও জুমআ ধরতে যাবে তার সঙ্গে সঙ্গে।

আনু মোল্লার নিত্যকার যত্নে মোটরসাইকেলটি এতটাই ঝা-চকচকে হয়ে উঠবে যেন তার ফুয়েল ট্যাংকের গায়ে কিংবা মাডগার্ডে গ্রামের অমল আকাশ, হলুদ ঠোঁটের শালিক, কলাগাছের কচি পাতা বিম্বিত হয়; গ্রামের লোকেরা বলাবলি করে যে, আনু মোল্লার মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংকের গায়ে মানুষের গোপন পাপ পর্যন্তও বিম্বিত হয়। তারা আরো বলে যে, আনু মোল্লা যখনই এবং যতবারই তার বাইকটি এইভাবে পরিষ্কার করতে যেতেন, তখনই এবং ততবারই সাইলেন্সারের ভেতর থেকে শীতসকালের কুয়াশার মতো বেরিয়ে আসত কোনো না কোনো পুরোনো পাপ; তার নিজের অথবা তার নিজ গ্রামের।

আনু মোল্লার বাবা মনোয়ার হোসেন মোল্লা ওরফে মনু মোল্লা জীবিতাবস্থায় এই গ্রামের মাতবর ছিলেন, যিনি সালিশ বসিয়ে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন; দুর্ভাগ্যের শিকার হওয়া সেসব মানুষ নীরবে সালিশ জানাতেন একজনের কাছে। সেই একজন লা শরিক। তিনি ঠিকঠিক ইহজগতে একদিন মনু মোল্লার সালিশ বসালেন। সেই তিনি ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। আজ থেকে তেরো বছর আগে সহসা একদিন মনু মোল্লা সেই যে গ্রাম থেকে নিখোঁজ হয়ে গেলেন, তারপর থেকে তাকে আর কোনোদিন কেউ কোথাও দেখেননি।

তো এই রকম একদিন জুমাবারে, যখন আনু মোল্লা তার প্রিয় মোটরসাইকেলটিকে সাফসুতরো করতে থাকবেন, তখন তিনি বুঝতে পারবেন কেউ একজন তার কাছে আসছে। দূর থেকেই তার পায়ের শব্দ শুনতে পাবেন। কাছে এসে সেই একজন আনু মোল্লাকে কিছু বলবেন। আনু মোল্লা আগন্তুকের দিকে মাথা ফেরাবেন না। তিনি গভীর মনোযোগে মোটরসাইকেল পরিষ্কারে ব্যস্ত থাকবেন। তিনি মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংকে নিজের চেনা মুখটা আবার দেখতে দেখতে বলবেন, ‘বিচার হবে।’

গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা জানতেন, আনু মোল্লার বাবা মনু মোল্লা যখন এই রকম সালিশে বলতেন, ‘বিচার হবে,’ তখন আকাশে চাঁদ যেন একটু সরে যেত। সালিশগুলো তখন বসত সন্ধ্যারও অনেক পরে এবং আশ্চর্য এই যে, প্রতিবারই এমন সালিশকালে আকাশে একটা হৃষ্টপুষ্ট চাঁদ দেখা যেত। আজকেও যখন সন্ধ্যারও অনেক পরে আনু মোল্লাদের বাড়ির দক্ষিণ অংশে পারিবারিক পুকুরের ধারে সালিশ বসবে, তখন জ্যৈষ্ঠের চাঁদটাকে অনেক বড় মনে হবে; মনে হবে, কেউ যেন চাঁদটাকে দড়ি দিয়ে টেনে অনেকটা নিচে নামিয়ে এনেছে। আগত লোকদের উপস্থিতি একটা বৃত্তাকার তৈরি করবে; চার বা পাঁচ বা ছয়জন অতি সৌভাগ্যবান চেয়ারে বা টুলে বা বেঞ্চে উপবিষ্ট হওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বাকিরা মাটিতে কিছু একটা পেতে বসবেন এবং দাঁড়িয়ে থাকবেন; দূর থেকে দেখলে মনে হবে, যেনবা একটা মৌমাছির চাক, ভেতরে গুঞ্জন চলছে।

অভিযুক্ত যুবক মনির মাথা নিচু করে বসে থাকবে। মনির মাছ ধরে, ধান কাটে, আর মাঝেমধ্যে থানা শহরের হাটে গিয়ে পাইকারি কোনো বিক্রেতার সহযোগী হিসেবে সারা দিন গতর খাটায় আর হাট শেষে সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরে। তো সেই রকম একটি দিনে বেশ রাতে যখন সে বাড়ি ফিরতে থাকবে, তখন গ্রামে ঢোকার পথটা থাকবে শান্ত আর সুনসান আর আকাশে থাকবে হৃষ্টপুষ্ট একটা চাঁদ। তো এই রকম একটা রাতে ঘটনাক্রমে সে ঘটনাটার একমাত্র সাক্ষী হয়ে থাকবে। আজ যেন তার চোখে সেই রাতের জোছনা আটকে থাকবে; যেন সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দগুলো যেন পুকুরের ঘন কচুরিপানার তলায় বারবার আটকে যাবে।

ঠিক তখনই এক অদ্ভুত শব্দ আসতে থাকবে; মনে হবে কেউ যেন পুকুরের জলের তলায় হাঁটছে। তখন কচুরিপানাগুলো একটু একটু সরে যেতে থাকবে। কচুরিপানাগুলো সরে যেতেই দেখা যাবে সারা গায়ে কাদামাখা একজন মানুষ জলের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসছে; মানুষটির গলা কাটা, বুকে বড় এক ক্ষত। মাথা না থাকলেও শুধু শরীর দেখেই বয়োজ্যেষ্ঠরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে যেন বলতে চাইবে যে, তেরো বছর আগে সহসা যে গ্রাম থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, এই কি সেই ব্যক্তি নয়! কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠরা আসলে এমন কোনোকিছুই বলবেন না।

সালিশে যথারীতি যা হয়ে থাকে, পক্ষ-বিপক্ষ বাকবিতণ্ডা। অতঃপর রায় ঘোষণার পালা।

আনু মোল্লা রায় ঘোষণা করবেন...

কিন্তু রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সহসা বাতাসের গতি বদলে যাবে। গাছের পাতা উল্টো দিক করে কাঁপতে থাকবে। বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো ও বড় আমগাছটার মোটা এক ডালে বাসা বাঁধা মৌমাছিরা অজানা শঙ্কায় চাক ছেড়ে দিগ্বিদিক উড়তে থাকবে।

ঝোড়ো বাতাস উঠবে এবং সেইসঙ্গে সহসা দেখা যাবে আনু মোল্লার রুপালি মোটরসাইকেল পুকুরের অপর পাড় থেকে বাঁশবাগানের অচ্ছুত পথটা ধরে কোনো এক অদ্ভুত ক্ষমতায় নিজে নিজে এগিয়ে আসছে। এগিয়ে এসে সালিশের ঠিক মাঝখানে থেমে পড়বে। তার সাইলেন্সার থেকে এখন আর কালো কালো ধোঁয়া নয়, বেরোচ্ছে রক্তের মতো লাল লাল ধোঁয়া। সেই লাল লাল ধোঁয়ায় সাদাকালো ইমেজের মতো ভেসে ভেসে উঠছে একটি রাতের সাক্ষ্য।

কেউ বুঝে ওঠার আগেই এক অদৃশ্য ধারালো কিছু আনু মোল্লার বুকে বিঁধবে। প্রথমে ভাববেন তাদের বাড়ির আমগাছে বাসা বাঁধা কোনো এক বেয়াদব মৌমাছি হুল ফুটিয়েছে। পরক্ষণেই তিনি বিস্মিত চোখে নিজের দিকে তাকাবেন, যেন প্রথমবার নিজেকে দেখছেন। তার সাদা পাঞ্জাবি লাল হয়ে উঠছে, আর সেই লাল রঙ ক্রমেই ফ্যাকাশে হয়ে ধবল জোছনার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

পরদিন সকালে পুলিশ আসবে, নানাজনের সাক্ষ্য নেবে, কাগজে কীসব লিখবে। গ্রামের উৎসুক কেউ কেউ পুলিশকে জানাবে, এই মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংকের গায়ে এই গ্রামের পাপ দেখা যায়। তখন পুলিশ মোটরসাইকেলটিকে জব্দ করে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে; কিন্তু গতকাল সালিশের সময়ে আকাশে যে একটা হৃষ্টপুষ্ট চাঁদ উঠেছিল, তার কথা কেউ উত্থাপন করবে না। তাই তার সাক্ষ্য নিতে পুলিশরা ভুলে যাবে; অথবা ভুল নয়, চাঁদের

কোনো সাক্ষ্য নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকারই হয়তো রাষ্ট্রের নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...