আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চোখে শুধু দেখছি সরষে ফুল…

বিউটি হাসু

চোখে শুধু দেখছি সরষে ফুল…

কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে শীতের সকাল ও বিকাল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় সরষে ফুলের মো-মো মিষ্টি সুঘ্রাণ! চোখে দেখছি শুধু সরষে ফুল। তবে এ দেখায় কোনো বিপদ বা নেতিবাচক কিছু নেই। আছে শুধু অপার মুগ্ধতা! দুচোখ জুড়িয়ে যায় সরষে ফুলের হলুদ অপরূপ সৌন্দর্যে। মুগ্ধতা ছড়ায় দিগন্তবিস্তৃত মাঠ জুড়ে ফুটে থাকা সরষে ফুল। মনে হয়, অবারিত মাঠ জুড়ে কে যেন হলুদ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। এ দৃশ্য বাংলাদেশের শীতের প্রকৃতির এক অনন্য রূপ। শীতের এ মৌসুমে সারা গ্রাম বাংলার মাঠ-ক্ষেতে যেন হলুদ গালিচা বিছানো।

বিজ্ঞাপন

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বারকুড়িয়া গ্রাম। ‘চোখে শুধু দেখছি সরষে ফুল’—এই কথাটির মানে এক্ষেত্রে বাংলা প্রবাদের বিপদে পড়ে হতভম্ব বা দিশাহারা হয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে আচ্ছন্ন হয়ে বিমুগ্ধ হয়ে থাকার অনুভূতি। বিশেষত সরষে ক্ষেতের হলদে রঙে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিস্তৃত মাঠ জুড়ে সরষে ফুলের মাধুর্য দেখে মনে হয়—এ যেন হলুদ ফুলের রাজ্য! এমন নজরকাড়া রূপ দেখে যখন খুব বেশি আনন্দ বা বিস্ময়ে মানুষ অভিভূত হয়ে পড়ে এবং সাময়িকভাবে কিছু ভাবতে পারে না, তখন কখনো কখনো চোখের সামনে হলদে আভা বা আলোর ঝলকানির মতো অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

আমার নানাবাড়ির সামনে বিস্তৃত মাঠ জুড়ে রয়েছে সরষে ক্ষেত। সরষে ফুলের চোখজুড়ানো অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ চোখ আর তৃপ্ত মন! ফুলের মিষ্টি সুবাসে মন ভরে যায়।

কুয়াশাভেজা সকালে সরষে ফুলে যখন রোদ পড়ে, মনটা তখন কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়। সরষে ফুলের সুবাসে মিশে থাকে গ্রামগঞ্জের মাটির ঘ্রাণ, আর শৈশবের নানা স্মৃতি। সরষে ক্ষেতে হাওয়া যখন দুলে ওঠে, তখন মনেও বয়ে যায় অদ্ভুত এক প্রশান্তি।

সরষে ফুলের এই মাঠগুলো শুধু হলুদ রঙ নয়, অজস্র স্মৃতি ধরে রাখে। আর সরষে ফুলের রূপে মুগ্ধ হয়ে ভাষা হারিয়ে কেউ নীরব থাকলেও তার ভেতরটা থাকে শব্দে ভরা। সেখানে খেলে শব্দের ঢেউ!

মাঠ জুড়ে সরষে ফুলের হাসি দেখে মনে হয়, বাংলা নিজের রূপে ফিরে এসেছে। সরষে ফুলের হলুদ মানে শুধু রঙ নয়, ওটা আমাদের শেকড়ের প্রতীক। সরষে ফুলের হলুদে লুকিয়ে থাকে বাংলার প্রাণের হাসি, কিষান-কিষানির প্রাণের স্পন্দন।

মাঠজুড়ে যখন সরষে ফুল ফোটে, মনে হয় সূর্য নেমে এসেছে মাটির বুকে। সরষে ফুলের হলুদ মানেই বাংলার বসন্তের উৎসব শুরু।

যে সরষে ফুলের মাঠ দেখেনি, সে বাংলার গ্রামের হৃদয় এখনো চিনতে পারেনি। সরষে ফুলের গন্ধে ভেসে আসে মমতাময়ী মায়ের আঁচল, শৈশবের মধুর স্মৃতি। সরষে ফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, সে বাংলার মানুষের প্রতিটি হৃদয়ের আয়না। সরষের মাঠের দিকে তাকালে মনে হয়, পৃথিবী এখনো সুন্দর; আর মন খুলে গাইতে ইচ্ছে করে—

‘এত সুন্দর পৃথিবী দেখিনি তো আগে,

যত দেখি ততই আমার দেখার ইচ্ছে জাগে।’

আর হলুদ সরষে ফুল বাতাসে যখন দোল খায়, তখন মনে হয়, হলুদের ঢেউ লেগেছে। এই দোল খাওয়া গান—নীরব অথচ প্রাণোচ্ছ্বাসে ভরা।

যে ব্যক্তি সরষে ফুলের মাঠে একবারও হাঁটেনি, সে জানতেই পারেনি—প্রকৃতি কীভাবে হাসে। সরষে ফুলের সৌরভে মিশে আছে বসন্তের প্রথম প্রেমের ছোঁয়া। মাটির গন্ধ, রোদ্দুরের ছোঁয়া আর সরষে ফুলের হাসি—এই তিনে মিলেই রূপসী বাংলাদেশ।

সরষের হলুদ বনে দাঁড়িয়ে মানুষ ভুলে যায় দুঃখ, ক্লান্তি আর অবসাদ। কেবল মনে থাকে জীবনে প্রাপ্তির আনন্দ। মনে হয়, প্রকৃতি যখন হাসতে চায়, তখন সরষে ফুল ফোটায়।

সরষে ফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, সে বাংলার প্রাণ, বাংলার কবিতা। যে চোখে সরষে ফুলের রঙ সরস রূপ দেখেনি, সে বঞ্চিত। যে একবার সরষে ফুলের মাঠে হেঁটেছে, সে বুঝেছে প্রকৃতি কীভাবে হাসে।

সরষের ক্ষেতে নিঃশব্দে ফোটে এক টুকরো শান্তি। সরষে ফুল শুধু ফোটে না, শীতের গান গায়। হলুদে মোড়া মাঠ যেন হাসির পরশ বুলায়। সোনালি ক্ষেতে খুঁজে পাই আত্মার শিকড়। সরষে ফোটার সময় বাতাসেও মিশে যায় স্মৃতির ঘ্রাণ। সরষের মাঠ মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সরলতায়।

সোনালি মাঠ, মাটির স্বপ্ন। সরষের ফুলের ভেতর দিয়ে হাঁটা মানে ফেলে আসা সময়কে ছুঁয়ে যাওয়া। সরষে ক্ষেতে সূর্যও যেন একটু থেমে যায়। সরষে ফুল শেখায়—আলো ছড়াও, না বলেই।

প্রতিটি সরষের পাপড়িতে যেন একেকটা গ্রাম বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। প্রতিটি সরষে ফুল যেন একেকটি কবিতা। মাঠের বুকে হলুদ সরষে যেন মাটির সঙ্গে আকাশের প্রেমপত্র।

শীতের রোদে সরষে ফুলের হাসি দেখলে মনও যেন রঙিন হয়ে যায়। সরষে যখন ফুলে, তখন প্রকৃতি নিজেই হলুদ শাড়ি পরে। সরষে ফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে হারিয়ে যাওয়া সময়ের ঘ্রাণ।

যেখানে সরষে ফুল ফোটে, সেখানে শব্দের দরকার হয় না—শুধু দেখলেই হয়। কৃষকের স্বপ্ন হলুদ হয়ে ফোটে মাঠজুড়ে। সরষে ক্ষেতে হাঁটা মানেই মাটির খুব কাছে চলে যাওয়া। সরষে ফুল জানে—সৌন্দর্য নিঃশব্দ হতে পারে। এই ফুল বলে দেয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কখনো পুরোনো হয় না। শীতের স্নিগ্ধতায় সরষের হলুদ ছড়িয়ে দেয় ভালোবাসার আলো। একটুখানি হলুদ, আর চারপাশ জুড়ে একরাশ শান্তি।

সরষে ফুল নিয়ে এবং বাংলার মাটির ঘ্রাণমিশ্রিত

কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি—

সূর্য যখন ডালে ঝুলে,

শিশির পড়ে পাতার কূলে,

সরষে ফুল দুলে দুলে,

বলছে যেন কানে কানে—

‘এসো, ফিরে যাও শৈশবে।’

সরষে ফুলের ক্ষেত মানেই এক টুকরো সোনালি স্বপ্ন! শীতের সকালে রোদে ঝলমলে সরষে ফুলের সৌন্দর্য যে কারো মন ভালো করে দিতে পারে। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য অনেকেই ছবি তুলে স্মৃতিতে ধরে রাখতে চান। সরষে ফুলের সুবাসে মিশে থাকে গ্রামগঞ্জের মাটির ঘ্রাণ, আর শৈশবের স্মৃতি।

হলুদ ফুলের মাঝে সূর্য ডুবে গেলে সেই দৃশ্যটা কোনো ছবির ফ্রেমে আটকে রাখা যায় না। তবে জীবনের জটিলতার ভিড়ে সরষে ফুলের সরলতা যেন শিখিয়ে দেয় সহজভাবে বাঁচার পাঠ। এই সরষে ফুলের মতন স্নিগ্ধতার উন্মেষ হোক আমাদের সবার জীবনে। সরষে ফুল শুধু ফুল নয়, এটা বাংলার ভালোবাসার রঙ। গ্রামের মেঠো পথে, সরষে ফুলের পাশে ভালোবাসা যেন আরো নরম হয়ে ওঠে।

নীল আকাশের নিচে, হলুদ সরষে ফুল! মাঠের দিগন্ত জুড়ে যেন হলুদের মেলা। প্রকৃতির এই হলুদ সর, যে ফুলের প্রান্তরে মিশে যায় জীবনের সব রঙ। শীতের সরষে ফুলের সোনালি আভা প্রকৃতিকে দেয় এক মোহনীয় রূপ। শীতের কুয়াশায় মাখা সকালে, সরষে ফুলের হলুদ এক চিলতে উষ্ণতা নিয়ে আসে মনে।

কুয়াশার চাদরে ঢাকা এই শীতে যেদিকে চোখ যায়, হলুদ সরষে ফুল যেন চোখ জুড়িয়ে দেয়।

সরষে ফুলের সোনালি সৌন্দর্যে ভালোবাসার এক অনন্য রঙ লুকিয়ে থাকে। প্রকৃতির এই রোমান্টিক পরিবেশে ভালোবাসার অনুভূতি যেন আরো গভীর হয়। প্রকৃতির নজরকাড়া এই সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে ভালোবাসার রোমান্টিক অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলা যায়—ভালোবাসার দুচোখে দেখি প্রকৃতির অনন্ত সবুজের মেলা, সঙ্গে আছে ভালোবাসার সরষে ফুল আর মৌমাছির নিরন্তর খেলা।

হলুদ ফুল মানেই উজ্জ্বলতা, আনন্দ আর ইতিবাচকতার প্রতীক। এর রঙ যেমন প্রাণবন্ত, তেমনি মনকেও ভরে দেয় উষ্ণতায়। হলুদ ফুলের মতো জীবন সুন্দর ও সরল হয়ে উঠুক। হলুদের রঙে লুকিয়ে থাকে একধরনের জাদু, যে জাদু মন খারাপ করা দিনটাকেও আলোকিত করে তোলে।

হলুদ ফুলের রঙে এমন এক মাধুরী আছে, যা ফুলের সৌন্দর্য আরো হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। হলুদ ফুলের রঙে মিশে থাকে সুখের ছোঁয়া, হাজারো আশা, নতুন দিনের সূচনা।

শীতের এই সময়ে সরষে ফুলের দারুণ হলদে প্রকৃতি দেখে আসতে পারেন চাইলেই। যেমন ঢাকার কাছেই আছে নন্দনকোণ। মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগরের নন্দনকোণ নামেই মুগ্ধতা ছড়ায়।

বাসাইল, সিরাজদিখান–প্রথম দৃষ্টিতেই প্রেমে পড়ার অবস্থা যাকে বলে। জায়গার নাম নাগেরপাড়া। নাগেরপাড়া সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আশ্চর্য হয়ে দেখি উজ্জ্বল হলুদ রঙে মাঠ সেজেছে। শুধু হলুদ বললে ভুল হবে। একবারে স্বর্ণাভ হলুদ। সরষে ক্ষেতের সেই হলুদ রঙ যেন আকাশে মিশেছে, সঙ্গে কচি সরষে ফুল দুলছে মিষ্টি উত্তুরে হাওয়ায়। পায়ে পায়ে সরষে ক্ষেতের দিকে এগিয়ে যেতেই সরষে ফুলের সৌরভে কী আশ্চর্য মাদকতা! সে মাদকতার টানেই মৌমাছিদের ভিড়; আর বকপাখিদের আনাগোনা।

প্রয়োজনীয় তথ্য সরষে দেখার এখনই সময়। সারা দেশ সরষে ফুলের হলুদ রঙে রঙিন হয়ে আছে। সরষে ফুলের সৌন্দর্য ও তার সুবাসে মুগ্ধ হতে চাইলে আজই বেরিয়ে পড়ুন। চলে যান ঢাকা থেকে মাওয়া রোড ধরে আবদুল্লাহপুর, লৌহজং বা সাইনপুকুর। এখানে পথে পথে সরষে ফুলের মুগ্ধতা। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের গ্রাম বেজেরহাটি, বাসাইল হয়ে নাগেরপাড়া বা নন্দনকোণ, ডেমরা হয়ে নরসিংদী বা আমিনবাজার পার হয়ে মানিকগঞ্জ কিংবা টাংগাইল। যেখানেই যান পুরোটাই মনে হবে হলুদ ফুলের রাজ্য।

চারদিকে হলুদের সমাহার। এ যেন রূপকথার রাজকুমারীর গায়ে হলুদ। সবাই কনেকে হলুদ দিতে এসেছেন। এসেছে প্রজাপতি, মৌমাছি, হলুদিয়া-নীলরঙা পাখি, পোকামাকড় থেকে শুরু করে রাজ্যের প্রজারা। সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে হলুদের ওপর। এখানে একটু রঙ পাওয়া যাচ্ছে। রোদ চড়লে হলুদও যেন জ্বলে উঠছে। তার সে কী মিষ্টি ঘ্রাণ!

সরষে ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় সবাই। সরষের এই ক্ষেত দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতি হলুদ চাদর পেতে রেখেছে। শীতকাল আসতেই ফুটে ওঠে সরষে ফুল। যেদিকেই চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ। তাই চাইলেই সরষে ফুলের নিখুঁত ও নিখাদ মাধুর্যে চোখ আর মন তৃপ্ত করতে পারেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...