‘নারীর অধিকার’—চমৎকার এক শব্দবন্ধ! বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘নারীর অধিকার’ বিষয়টি যেন কেবল বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। মঞ্চে বক্তৃতার ঝংকার তুলতে এই শব্দবন্ধই যথেষ্ট। নারী দিবসে এটি উচ্চারণ করলে হাততালি মেলে, টেলিভিশনের টকশোতে আওড়ালে বিজ্ঞাপনের বিরতিতে স্পন্সরের আশীর্বাদও পাওয়া যায়। দিন-তারিখ গুনে দিবস আয়োজিত হয়, টকশো সাজানো হয়, বক্তারা কণ্ঠ উঁচু করে বলেন, ‘নারী-পুরুষ সমান অধিকার!’ কেউ বলেন, ‘নারীর পোশাকের স্বাধীনতা থাকতে হবে।’ আবার আরেকজন যোগ করেন, ‘নারীর মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে।’ এভাবে এমন এক অদৃশ্য মঞ্চ তৈরি হয়, যেখানে মনে হয় নারীর জীবনে এর চেয়ে মহিমান্বিত আর কিছু নেই। আমাদের সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে এমন এক কৃত্রিম উৎসব চলে, যেন পৃথিবীটা আজ নারীর জন্য একেবারেই স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। জীবনের বাস্তবতায় যখন নারী প্রবেশ করে, তখনই শুরু হয় আসল নাটক। সেখানে অধিকারগুলো কেবল শব্দের মালা হয়ে ঝুলে থাকে, জীবনের নাট্যমঞ্চে তার কোনো সংলাপই থাকে না। মেয়েদের প্রতিদিন শোনানো হয়—‘তুমি তো মেয়ে! তোমার আবার কীসের এত অভিব্যক্তি? মতামত প্রকাশের দরকার কী?’ অথচ একই কণ্ঠ আবার শেখায়—‘তোমাকে অবশ্যই নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতে হবে।’ কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! যেন এক হাতে ফুল ধরিয়ে দেওয়া হলো, আরেক হাতে সেই ফুলের কাঁটায় ঠোঁট ছিঁড়ে ফেলা হলো।
পোশাকের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও নাটক কম নয়। আধুনিক বা ওয়েস্টার্ন পোশাককে বলা হয় প্রগতির আলোকবর্তিকা। কিন্তু কোনো নারী যদি হিজাব নেয়, নিকাবে নিজেকে আড়াল করে, সঙ্গে সঙ্গেই শোনা যায় শ্লেষভরা মন্তব্য—‘এটা তো জঙ্গি-শিবিরের পোশাক, এটা তো বাঙালি সংস্কৃতির অন্তরায়।’ যেন শরীর ঢেকে রাখলেই নারী তার মানবিক পরিচয় হারিয়ে ফেলে। প্রশ্ন আসে—প্রগতির মানদণ্ড কি সত্যিই শরীর ঢাকার বা না ঢাকার ওপর নির্ভর করবে, নাকি প্রগতির মানে হবে নারীর স্বকীয়তা এবং তার নিজের পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা? কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাটাই বা কোথায়? শ্রেণিকক্ষে, পরীক্ষার হলে এবং কর্মক্ষেত্রে নিকাব পরা নারীকে দেখা হয় ভিন্ন চোখে। অনেক সময় তাকে বাধ্য করা হয় নিকাব খুলে ফেলতে।
আবার কোনো নারী যদি সহশিক্ষা না চেয়ে মানববন্ধন করে, তখন তাকে সভ্যতার পাঠ শেখানোর নামে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে চলে অনলাইন-অফলাইন বুলিং, চলে কুরুচিপূর্ণ কটূক্তি; এমনকি তাকে তুলে নেওয়া বা ধর্ষণের মতো ভয়ংকর হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাও চলে। তাহলে কোথায় সেই নারীর অধিকার? যে অধিকার শুধু মুখে মুখে ফুলঝুরি, প্রয়োজনে চাপা পড়ে যায় সমাজের ভণ্ড প্রগতির আড়ালে—সেটি কি আসল অধিকার, নাকি নিছক স্লোগান? নারী যদি নিজের জীবন নিয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে না পারে—পোশাকের হোক, শিক্ষার হোক, মত প্রকাশের হোক—তবে তার স্বাধীনতার নামের যে উৎসব চলছে, সেটি নিছক প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
নারীর অধিকার মানে কেবল ওয়েস্টার্ন পোশাক নয়, কেবল স্লোগানের উচ্চকণ্ঠও নয়। প্রকৃত অধিকার মানে হলো নারী তার জীবন, বিশ্বাস ও পরিচয় বেছে নেবে নিজের ইচ্ছায়। হিজাব বা নিকাব পরা যেমন অধিকার, না পরাটাও তেমনি অধিকার। অথচ এই বেছে নেওয়ার ক্ষমতাই সমাজ বারবার কেড়ে নিচ্ছে। অতএব, প্রশ্নটা থেকেই যায়—আমরা কি সত্যিই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি, নাকি কেবল কাগজের ব্যানারে, টকশোর মঞ্চে আর দিবসের ফুলঝুরিতে ‘নারীর অধিকার’ নামের এক প্রহসন সাজিয়ে যাচ্ছি?
আজ আমরা উন্নয়ন, সমতা, টেকসই সমাজ গড়ার নামে বড় বড় বুলি আওড়াই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নারীর স্বাধীনতাকে এমনভাবে গলা টিপে ধরি যে সে নিঃশ্বাসটুকুও নিতে পারে না। অথচ নারীর অধিকার কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকার। এটিকে বারবার অবহেলা করা মানে শুধু নারী নয়, গোটা সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। তাহলে বলুন তো, আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? নারীর অধিকার কি সত্যিই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে; নাকি ‘নারীর অধিকার’ নামের এক নাটক আমরা প্রতিনিয়ত মঞ্চস্থ করছি—যেখানে সংলাপ আছে, আবেগ আছে; কিন্তু বাস্তব জীবনে নেই কোনো আলো, নেই কোনো মুক্তি।
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

